জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের করণীয় কাজ বা আমল, কুরবানি কি ওয়াজিব নাকি সুন্নত?

0

মুসলিম বিশ্বের দুটি খুশির দিনের একটি হচ্ছে ঈদুল আযহার দিন। এই দিনের অন্যতম বড় ইবাদত হচ্ছে কুরবানি করা। একমাত্র আল্লাহর খুশির জন্য নিজের পছন্দের বা ক্রয়কৃত পশু কুরবানি করা হয়ে থাকে এই দিনে। ঈদুল আজহার দিনে কুরবানির চেয়ে উত্তম আমল আর নাই। তাই ইসলামপ্রিয় লোকদের মনে কুরবানি আসার আগেই অনেকগুলো প্রশ্ন উকি দেয়। যেমনঃ

  • কুরবানি ওয়াজিব নাকি সুন্নত?
  • কার উপর কুরবানি ওয়াজিব?
  • স্বামী কুরবানি দিলেই তা স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে কিনা?
  • স্ত্রীর গহনা থাকলে, ক্যাশ টাকা না থাকলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব কিনা?
  • স্ত্রীর কুরবানির টাকা কি স্বামীকেই দিতে হবে কিনা?
  • কুরবানির গরুতে ভাগের সংখ্যা কেমন হবে? কুরবানির গরুর ভাগ বিজোড় সংখ্যায়ই হতে হবে কিনা?
  • কুরবানির আগ পর্যন্ত জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন কী কী আমল করতে হবে?

ইত্যাদি প্রশ্নগুলো বিচ্ছিন্ন ভাবে আমাদের মাথায় আসে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আলাদা আলাদা ভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করাও কঠিন ব্যাপার।

কুরবানি যেহেতু বছরে একবার আসে তাই এর বিভিন্ন বিধি-বিধান ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিক। এই ব্লগ পোস্টে কুরবানি ও জিলহজ্জ মাসের করণীয় এবং প্রচলিত বেশ কিছু ভুল ধারণা ও বর্জনীয় কাজের বর্ণনা পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।

ঈদুল আযহা ২০২২ কত তারিখে?

২০২২ সালের ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হবে ১০ জুলাই ২০২২ ইং তারিখ রোজ রবিবার। বাংলাদেশের আকাশে ৩০ জুন সন্ধ্যায় জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা গিয়েছে। সে হিসাবে ১০ জিলহজ্জের তারিখ ঈদুল আযহার দিন পড়েছে ১০ জুলাই রবিবার। ঈদ উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকবে ৩ দিন যথাক্রমে ৯, ১০ ও ১১ জুলাই ২০২২ ইং তারিখ রোজ শনি, রবি ও সোমবার। এক্ষেত্রে ঈদের আগের দিন শনিবারের ছুটিটি পড়েছে সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবারে।

জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের করণীয় কাজ বা আমল

রমজানের শেষ ১০ দিনের পর জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দের।

তাই এই দশদিন আমরা সাধ্য মত যত বেশি পারা যায় নফল রোজা, নফল নামাজ, তাসবীহ-তাহলীল, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি নেক আমলগুলো পালন করার চেষ্টা করি।

ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ‘আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের ‘আমলই উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না। (বুখারী ৯৬৯)

নিচে জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের কয়েকটি আমল উল্লেখ করা হলো।

  1. সুন্নাহ অনুসরণ করে আল্লাহর যিকির বা স্মরণ করা। সকল কাজের মাসনূন দুয়া বা বিসমিল্লাহ বলাও আল্লাহর যিকিরের অন্তর্ভুক্ত
  2. বেশি বেশি নেক আমল করা (কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, ১ম ৯ দিন নফল রোজা, দান-সদকা ইত্যাদি)
  3. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা
  4. হজ্জ করা (যাদের উপর হজ্জ ফরজ)
  5. কুরবানি আদায় করা (যাদের সামর্থ্য আছে)
  6. যারা কুরবানির নিয়ত করেছে তাদের জন্য জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে ঈদের দিন পশু কুরবানির আগ পর্যন্ত চুল-নখ ও অন্যান্য পশম না কাটা। জিলহজ্জের চাঁদ দেখা যাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় চুল-নখ কেটে পরিচ্ছন্ন হয়ে নেয়া উচিত। আর কুরবানি হয়ে যাওয়ার পর আবার প্রয়োজনীয় চুল-নখ কাটা।
  7. জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিনই বেশি বেশি তাকবির-তাহমিদ-তাহলিল পাঠ করা (اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لَاإِلٰهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ وَلِلهِ الحَمْدُ)। চলতে ফিরতে বা অবসর সময়ে পুরুষের জন্য সম্ভব হলে উচ্চস্বরে আর নারীরা নিচু স্বরে এটা পাঠ করবে
  8. আইয়ামে তাশরিকের দিনগুলোর (৯ জিলহজ্জ থেকে ১৩ জিলহজ্জ) ফরজ নামাজের পর অন্তত একবার উপরে বর্ণিত তাকবির-তাহমিদ-তাহলিল পাঠ করা। এর নিয়মটি হচ্ছে, ৯ জিলহজ্জ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ্জ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর একবার তাকবির-তাহমিদ-তাহলিল পাঠ করা ওয়াজিব। এই তাকবির পাঠ না করলে গুনাহ হবে। অনেকে ফরজ নামাজের পর ৩ বার তাকবির বলাকে সুন্নত বলে প্রচার করে থাকেন। আসলে এই তাকবিরটি সারা দিনই পড়া যায়। কিন্তু নামাজের পর ৩ বার পড়াকে সুন্নত মনে করলে সেটা ভুল হবে। কারণ হাদীস দ্বারা নামাজের পর ৩ বার এই দুআ পাঠ করার প্রমাণ পাওয়া যায় না। আমরা ইচ্ছা মত ১ বার, ২ বার, ৩ বার, ৫ বার, ১০ বার পড়তে পারি। কিন্তু হাদীসের দলীল ছাড়া ভিত্তিহীন কথা বলে ৩ সংখ্যাটিকে সুন্নত মনে করা যাবে না।
  9. আরাফার দিন রোজা রাখা। এদিন রোজা রাখলে আগের ও পরের এক বছরের গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন। হাদীসে বলা হয়েছে “আরাফার দিন” রোজা রাখার জন্য। হজ্জের সময় আরাফায় উপস্থিত থাকতে হয় ৯ জিলহজ্জ। ৯ জিলহজ্জ রোজা রাখলে আমরা কি বাংলাদেশের চাঁদ দেখে ৯ জিলহজ্জ রাখব নাকি মক্কার সাথে মিলিয়ে আরাফার দিন রাখব? উভয়টার পক্ষেই মত পাওয়া যায়। যেহেতু জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন নেক আমলের সওয়াব অনেক বেশি, তাই কনফিউশন না রেখে আমাদের দেশের চাঁদ অনুযায়ী ৮ ও ৯ জিলহজ্জ উভয় দিনই রোজা রাখার পরামর্শ দেন অনেক আলেম। তাতে হাজীদের আরাফায় অবস্থানের দিন এবং আমাদের দেশের হিসাবে ৯ জিলহজ্জ রোজা রাখা দুইটাই হয়
  10. ঈদের দিন ঈদের নামাজ পড়া
  11. ঈদের দিন মিসওয়াক করে অযু সহ উত্তম রূপে গোসল করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, ঈদের নামাজ মাঠে বা খোলা স্থানে অর্থাৎ ঈদগাহে পড়া, এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া ও অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা
  12. ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেয়ে ঈদের নামাজে যাওয়া। ঈদুল আযহার দিন কিছু না খেয়ে ঈদের নামাজে যাওয়া। নামাজ থেকে ফিরে এসে কুরবানি করার পর কুরবানির গোশত দিয়ে দিনের খাওয়া শুরু করা মুস্তাহাব।
  13. ঈদের নামাজের পর কুরবানি করা। ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করলে কুরবানি আদায় হবে না।

রমজানে আমাদের জীবনে কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসে। আমরা অন্যান্য সময়ের তুলনায় আরো বেশি আল্লাহমুখী হই। কিন্তু সেই তুলনায় জিলহাজ্জের এই ফজিলতপূর্ণ সময়ের ব্যাপারে আমরা গাফেল থাকি। জিলহজ্জ মাস আসলেই আমরা কুরবানি নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে অন্য কোনো দিকে খেয়াল থাকে না। আসুন এই ১০ দিন আমরা ইবাদতের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেই।

আল কোরআনের সূরা সমূহ বাংলা অনুবাদ, ফজিলত, আয়ত, রুকু আরবি ও বাংলা উচ্চারণ

কুরবানি কি ওয়াজিব নাকি সুন্নত?

কোনো একটা আমলের বিধান ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ, সুন্নত, মুস্তাহাব, নফল ইত্যাদি হতে পারে। গুরুত্বের বিবেচনায় এই স্তরগুলো সাধারন মানুষের বুঝার সুবিধার্থে ইমামগণ নির্ধারন করেছেন। যেমন হানাফী মাজহাবের অনুসারে কোনো একটা নির্দেশ সরাসরি কুরআনের থেকে পাওয়া গেলে সেটি পালন করা ফরজ। যেমনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রামাদানের সাওম। অপর দিকে কোনো একটা নির্দেশ কুরআনে পাওয়া যায় না কিন্তু হাদীস শরীফ থেকে শক্ত ভাবে নির্দেশ পাওয়া যায়, সেগুলোকে বলা হয় ওয়াজিব। যেমনঃ বিতিরের নামাজ পড়া, কুরবানি করা ইত্যাদি। গুরুত্বের বিবেচনায় ওয়াজিবের অবস্থান ফরজের একটু নিচে কিন্তু দুটোই প্রায় কাছাকাছি। ফরজ ও ওয়াজিব যে কোনো আমল ছেড়ে দিলেই গুনাহগার হতে হবে।

হাদীস শরীফে কুরবানির বিধান ফরজ, ওয়াজিব নাকি সুন্নত এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। ইমামগণ বিভিন্ন হাদীস অধ্যয়ন করে নিজ নিজ মতের উপর মাসআলা দিয়েছেন। এক্ষেত্রে হানাফী ফিকহের মাসআলা হচ্ছেঃ প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর (যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক) প্রতি বছর কুরবানি করা ওয়াজিব। এটি আদায় না করলে গুনাহ হবে।

আর অন্য মাজহাবের ইমামদের একটি মত রয়েছে; তা হলো কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। অর্থাৎ এটি এমন কোনো সুন্নত নয় যেটি ঐচ্ছিক, এটি তাকিদযুক্ত সুন্নত। যেমন আসরের নামাজের আগে ৪ রাকাত সুন্নত নামাজ পড়া একটি ঐচ্ছিক সুন্নতের উদাহরণ। কুরবানি এমন কোনো ঐচ্ছিক সুন্নত নয় যেটি পালন না করলে কোনো সমস্যা নাই। বরং কুরবানির ব্যাপারে অনেক দৃঢ় ভাবে হাদীসে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নবী (সা) বলেছেনঃ “সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করলো না সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে”। তাই অধিকতর সতর্কতার দাবী হলো সামর্থ্যবান হলে অবশ্যই কুরবানি করা।

আহলে হাদীস মাজহাবের ভাইয়েরা কুরবানিকে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ মনে করেন এবং এই মতের উপর আমল করেন। একই সাথে প্রচার করেন কুরবানি ওয়াজিব নয় বরং সুন্নত বা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। ফলে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ আমরা যারা হানাফী মাজহাব অনুসরণ করি, তাদের অনেকের মধ্যেই এ ধারণা তৈরি হয়ে থাকে যে “কুরবানি তো সুন্নত! তার মানে কুরবানি না করলেও কোনো সমস্যা নাই”। তাই ভাইদের প্রতি অনুরোধ করব, এমন বাক্য বা শব্দ ব্যবহারে সতর্ক হই যেটির একটি নির্দিষ্ট অর্থ সমাজে প্রচলিত। যেমন আমাদের সমাজে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে দাড়ি রাখা সুন্নত। তাই অনেকে দাড়ি রাখেন না, কারণ এটি তো সুন্নত। না রাখলেও সমস্যা নাই। আসলে এটি তো কোনো ঐচ্ছিক সুন্নত নয়। এটি নবীজির (সা) আমল সে হিসাবে সুন্নত। কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে ওয়াজিব। অর্থাৎ বুঝাতে চাচ্ছি যে, সমাজে সুন্নত শব্দের দ্বারা এমন কাজকেই মানুষ বুঝে থাকে যেটি ঐচ্ছিক ভাল কাজ। করলে সওয়াব আছে না করলে গুনাহ নাই। তাই কুরবানিকে শুধু সুন্নত বলে প্রচার করে সমাজে ভুল ধারনা তৈরিতে যেন আমাদের কোনো কন্ট্রিবিউশন না থাকে।

কুরবানি কার উপর ওয়াজিব

কুরবানি ঈদের প্রথম দিন, অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে জিলহজ্জ মাসের ১২ তারিখ সূর্যাস্তের মধ্যে প্রাপ্তবয়ষ্ক কেউ যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারি হয় তাহলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। নিসাবের পরিমাণ সম্পদের হিসাব হচ্ছে প্রয়োজনীয় অর্থ সম্পদের বাইরে অতিরিক্ত সম্পদের মূল্যমান ৫০ হাজার টাকার মত হওয়া। যা সাড়ে ৫২ ভরি রূপার মূল্য। নাবালেগ শিশু যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তাহলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না।

  • ২০২২ সালের ১৫ জুন তারিখে সাড়ে ৫২ ভরি রূপার মূল্য ৪৮,৯৭২ টাকা থেকে ৭৯,৫৮০ টাকা। যেখানে প্রতি ভরির দাম ৯৩৩ টাকা থেকে ১৫১৫ টাকা।
  • আজকের সোনার দাম ও আজকের রূপার দাম জানতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সতিমির ওয়েবসাইট দেখুন। সেখানে স্বর্ণ ও রূপার মূল্য গ্রাম হিসাবে দেয়া আছে। ১১.৬৬ গ্রামে ১ ভরি। তাই জুলেয়ার্স সমিতির ওয়েবসাইটে থাকা রূপা বা সোনার মূল্যে গ্রামে যে দাম দেয়া আছে, তার সাথে ১১.৬৬ গুণ করলে ভরি হিসাবে দাম পাওয়া যাবে। যেমনঃ সনাতন রূপার দাম দেয়া আছে ১ গ্রামের দাম ৮০ টাকা। তাহলে সনাতন রূপার ১ ভরির দাম হবেঃ ৮০x১১.৬৬ = ৯৩২.৮ টাকা

আমরা অনেকেই মনে করি নিসাব হয় শুধু সোনা-রূপা থাকলে। আসলে তা না। নিসাবের হিসাব হয় সোনা, রূপা, ক্যাশ টাকা ও জমিজমার উপর ভিত্তি করে। আপনার নিসাব পরিমান সম্পদ আছে কিনা সেটা হিসাব করতে পারেন এভাবেঃ

  1. আপনার মালিকানায় থাকা স্বর্ণের বর্তমান বিক্রয়মূল্য (স্বর্ণ বিক্রি করতে গেলে এখন যত টাকা পাবেন)
  2. আপনার মালিকানায় থাকা রূপার বর্তমান বিক্রয়মূল্য
  3. আপনার সাথে থাকা দৈনন্দিন খরচের অতিরিক্ত ক্যাশ টাকা, ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি
  4. আপনার বসবাসের বাড়ি ছাড়া (যেখানে আপনি থাকেন না) অন্যান্য ফ্ল্যাট-বাড়ি-দোকান যেগুলো ভাড়া দেয়া আছে সেই ভাড়ার পরিমাণ
  5. এছাড়াও অন্যান্য সম্পদ যেগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য্য নয় বরং সম্পদ হিসাবে আমরা জমা করি সেগুলোর বিক্রয়মূল্য

এইরকম সবগুলোর মূল্য যোগ করে যদি ৫২-৫৫ হাজার টাকার মত পাওয়া যায় তাহলেই ধরে নিতে হবে আপনি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক।

যদি জিলহজ্জের ১০ তারিখ সূর্যোদয় থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের মধ্যের এই সময়ে আমার কাছে খাওয়া-দাওয়া, পোষাক-পরিচ্ছদ, প্রয়োজনীয় বাড়ি-ঘর ইত্যাদির বাইরে উদ্বৃত্ত সম্পদের পরিমাণ (সাড়ে ৫২ ভরি রূপার মূল্য অনুযায়ী) ৫২-৫৫ হাজার টাকার মত হয় তাহলে আমার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। উল্লেখ্য যে, যাকাতের মত কুরবানি ওয়াজিব হবার জন্য এই অতিরিক্ত সম্পদটা আমার হাতে ১ বছর গচ্ছিত থাকা শর্ত নয়। উক্ত ৩ দিনের যে কোন সময় অতিরিক্ত সম্পদের মালিক হলেই তার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে।  রূপার দাম নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। যেমন নতুন রূপা কিনতে গেলে প্রতি ভরি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় পাওয়া যায়। পুরাতন রূপা পাওয়া যায় ৪০০-৪৫০ টাকা ভরি। আলেমগণ বলেন নিসাবের হিসাব তেমনই করা উচিত যাতে গরীবরা উপকৃত হয়। পুরাতন রূপার হিসাবে নিসাবের পরিমান দাঁড়ায় ২৫-৩০ হাজার টাকার মত। আমাদের তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতির উপর নির্ভর করে, আমরা কোনটিকে নিসাব হিসাবে গন্য করব।


আল কোরআনের সূরা সমূহ বাংলা অনুবাদ, ফজিলত, আয়ত, রুকু আরবি ও বাংলা উচ্চারণ

পরিবারের থেকে যে কোনো একজন কুরবানি করলেই কি সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে?

এক পরিবারে একাধিক ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব হলে তাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ কুরবানি আদায় করতে হবে। সবার পক্ষ থেকে একজন কুরবানি আদায় করলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হবে না। যৌথ পরিবার হলে বাবার সাথে অন্যান্য ছেলেরাও যদি সামর্থ্যবান হয় তাহলে শুধু বাবা কুরবানি করলে ছেলেদের কুরবানি আদায় হবে না। ছেলেদেরকেও আলাদা ভাবে কুরবানি করতে হবে। আবার ছেলের সংসারে থাকা বাবা-মা যদি সম্পদশালী না হন তাহলে বাবা-মায়ের উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে না। ছেলে সম্পদশালী হলে ছেলের উপর ওয়াজিব হবে। স্বামী ও স্ত্রী যদি আলাদা আলাদা ভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হন তাহলে উভয়ের উপর আলাদা আলাদা কুরবানি ওয়াজিব হবে। স্বামী কুরবানি দিলে স্ত্রীর আদায় হবে না। বা স্ত্রী কুরবানি দিলে স্বামীর আদায় হবে না। এটি হানাফী মাজহাবের মত। অন্য মাজহাবের ইমামদের এমন মত রয়েছে যে, পরিবারের পক্ষ থেকে একজন কুরবানি দিলে কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। তবে হানাফী মাজহাবের মতটি অধিক শক্তিশালী, অধিক সতর্কতাযুক্ত এবং অধিক সওয়াবের অধিকারী হতে সহায়ক।

যদি স্ত্রীর নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ বা অন্যান্য সম্পদ থাকে কিন্তু কুরবানি দেয়ার মত ক্যাশ টাকা না থাকে তাহলেও স্ত্রীর উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। স্বামী যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি করেন তাহলে স্ত্রীর কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু স্বামী যদি তা দিতে অপারগ হন বা না দেন তাহলে যেভাবেই হোক স্ত্রীকে কুরবানি আদায় করতে হবে। প্রয়োজনে সম্পদ বিক্রি করে হলেও কুরবানি দিতে হবে। অন্যথায় ওয়াজিব আদায় না করার জন্য কঠিনতম গুনাহের ভাগীদার হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্ত্রীর উপর কুরবানি ওয়াজিব হলে স্বামীর উপর সেটা আদায় করা বা স্ত্রীকে কুরবানির টাকা দেয়া স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক নয়। স্বামী যদি স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি দিয়ে দেয় তাহলে ভাল, কিন্তু না দিলে তার কোনো গুনাহ হবে না। আমাদের দেশে আমরা কথার কথা বলি টাকা পয়সা যা আছে সবই তো স্বামী-স্ত্রী দুইজনেরই! দুইজন আর আলাদা কী? ইসলাম তা বলে না। ইসলাম স্বামী ও স্ত্রীর আলাদা সম্পদের মালিকানার কথা বলে। তাই নামাজ-রোজার মত যাকাত, কুরবানি, হজ্জও সম্পদ থাকা সাপেক্ষে স্বামী-স্ত্রীর উপর আলাদা আলাদা ভাবে ফরজ হয়।

যিনি কুরবানি করবেন তিনি তার পরিবারের সকলের পক্ষ থেকে কুরবানি করবেন। অর্থাৎ পরিবারের ছোট-বড় বাকি যারা আছে কুরবানি করতে পারে নাই তাদেরকেও শুধু নিয়তে মাধ্যমে কুরবানিতে সামিল করা যাবে। যেমন পরিবারের বাবা শুধু সম্পদশালী হলে (স্ত্রী সন্তানদের নিসাব পরিমান সম্পদ না থাকলে) তিনি কুরবানি করবেন তার স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে। বাবার এই নিয়তের কারণে এই কুরবানিতে স্ত্রী-সন্তানেরাও সওয়াবের ভাগিদার হবে। কিন্তু একথার মানে এই নয় যে, পরিবারের পক্ষ থেকে কর্তা ব্যক্তি কুরবানি করলে অন্যান্য যাদের উপর কুরবানি ওয়াজিব তাদের কুরবানিও আদায় হবে। বরং যিনি কুরবানি করবেন তিনি তার পরিবারের যারা কুরবানি করতে সামর্থ্যবান নয় তাদেরকেও সওয়াবের ভাগীদার করার উদ্দেশ্যে নিয়ত করবেন। একই ভাবে মৃত আত্মীয়স্বজনদের কথা নিয়তের মধ্যে এনেও তাদেরকে কুরবানির সওয়াবের অংশীদার করা যাবে। অনেক আলেম মৃত ব্যক্তির নামে আলাদা করে কুরবানি করাকে জায়েজ বলেছেন। আবার অনেক আলেম বলেছেন এটা সুন্নাহ পরিপন্থি কাজ। তাদের মতে যদি কোনো মৃত ব্যক্তির সওয়াবের জন্য আলাদা কুরবানি দেয়া হয় তাহলে ঐ কুরবানির সমস্ত গোশত দান করে দিতে হবে। কারণ দান-সাদকার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিদের জন্য সওয়াব পৌঁছানো যায়।

একই ভাবে রাসূল (সাঃ) এর জন্য কুরবানি করা নিয়েও আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। একদল আলেমের মতে এটা খুবই উত্তম আমল। আরেকদল আলেমের মতে এটা বিদআত। কারণ সাহাবীদেরকে রাসূল (সাঃ) এর পক্ষ থেকে কুরবানি করার নজীর পাওয়া যায় না। শুধু আলী (রাঃ) থেকে পাওয়া যায় যে তিনি রাসূল (সা) এর পক্ষ থেকেও কুরবানি করতেন। কারণ রাসূল (সা) আলীকে (রা) এ ব্যাপারে নসিহত করেছিলেন। মুহাদ্দীসগণের মতে এই হাদীসের বর্ণনা সূত্রটি দূর্বল, এটি জয়ীফ বা দূর্বল হাদীস। আলী (রা) আসলেও রাসুলের (সা) পক্ষ থেকে কুরবানি করেছেন কিনা সেটা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। আর করে থাকলেও হয়ত সেটা শুধু আলীর (রা) জন্যেই নসিহত বা আলীর (রা) জন্যেই বিশেষ নির্দেশনা ছিল। আল্লাহ ভাল জানেন।

যাই হোক, ফিরে আসি কুরবানির বাকি আলোচনায়। যার উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়, তিনিও চাইলে কুরবানি দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে কুরবানি করলে তিনি সওয়াব পাবেন, না করলে গুনাহ হবে না। কিন্তু যার উপর কুরবানি ওয়াজিব, তিনি কুরবানি আদায় না করলে ওয়াজিব ভঙ্গ করার গুনাহ হবে। যার উপর কুরবানি ওয়াজিব তিনি নিজের পক্ষ থেকে কুরবানি না দিয়ে তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে বা বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে কুরবানি দিলে তার কুরবানি আদায় হবে না। অর্থাৎ, কোনো একজনের উপর কুরবানি ওয়াজিব। কিন্তু তিনি কুরবানির টাকা তার বাবাকে দিয়ে বললেন কুরবানি করতে। বা তার বাবার পক্ষ থেকে সে কুরবানি করে দিল। তাহলে সেটা তার বাবার কুরবানি হিসাবে গণ্য হবে। সে নিজে আলাদা কুরবানি না করলে, ওয়াজিব ছেড়ে দেয়ার জন্য গুনাহ হবে। আমাদের সমাজে এটা প্রায়ই দেখা যায় যে, ছেলে সামর্থ্যবান হয়েছে। তখন কুরবানিতে নিজের পক্ষ থেকে না দিয়ে বাবাকে টাকা দিয়ে বাবার পক্ষ থেকে কুরবানি করেন। বাবাকে সম্মান প্রদর্শনের জায়গা থেকেই কাজটা করা হয়ে থাকতে পারে। নিজের ওয়াজিব কুরবানি এরকম বাবা বা মায়ের পক্ষ থেকে দেয়া যাবে না। দিলে নিজের কুরবানি অনাদায় থেকে যাবে। যার জন্য গুনাহগার হতে হবে।

কুরবানি না দিয়ে এর টাকা দান করে দেয়া যাবে কি?

কুরবানির আগে একদল মানুষকে দেখা যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারনা চালান। তারা কুরবানি না করে টাকাগুলো গরিবদের কল্যানে দান করার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে থাকেন।

কোরবানী ওয়াজিব হবার পর কোরবানি না করে সেই টাকা দান করলে বা কারো সাহায্যে খরচ করলে কুরবানি আদায় হবে না। এতে দান করার সওয়াব হবে। কিন্তু ওয়াজিব হওয়া কুরবানি আদায় না করার গুনাহ হবে। কুরবানী না দিয়ে সেই টাকা মসজিদ-মাদরাসায় দিলেও দানের সওয়াব হবে, কিন্তু কুরবানী না করার জন্য গুনাহ হবে। রাসূল (সাঃ) ঐ ব্যক্তিকে ঈদগাহে আসতে নিষেধ করেছেন যার কুরবানি দেয়ার সামর্থ্য আছে, কিন্তু সে কুরবানি করল না। তাই আমাদের সকলের উচিত সামর্থ্য থাকলে কুরবানি আদায় করা। দানের উদ্দেশ্য থাকলে কুরবানি করে পুরো গোশতটাই দান করে দেয়া যায়। এতে কুরবানি আদায় হলো এবং দানেরও সওয়াব পাওয়া গেল।

কুরবানি ও ঈদুল আযহার দিনে করণীয় কিছু কাজ

  1. কুরবানির পশু নিজে জবাই করা। জবাই করা সম্ভব না হলে সামনে উপস্থিত থাকা। নবী (সাঃ) হজরত ফাতেমাকে (রাঃ) বলেছিলেন কুরবানির সময় উপস্থিত থাকতে।
  2. পশু কুরবানির সময় যারাই ছুড়িতে হাত রাখবেন প্রত্যেককেই বিসমিল্লাহ বলতে হবে। ছুড়িটি হতে হবে ধারালো।
  3. যে সকল স্থানে জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব সেসকল স্থানে কুরবানী করতে হবে ঈদের নামাজের পরে। যদি কেউ নামাজের আগে কুরবানি করে তাহলে তা আদায় হবে না। নামাজের পর নতুন করে আরেকটি পশু কুরবানি করতে হবে।
  4. কুরবানির গোশত নিজেরা খাওয়া যাবে, বিতরন করা যাবে এবং ভবিষ্যতের জন্য জমা করে রাখা যাবে। কয়েকটি সহীহ হাদীসে পাওয়া যায় ৩ দিনের বেশি কুরবানির গোশত না খাওয়ার জন্য। এই হাদীসগুলো ছিল দুর্ভিক্ষের সময়কালের। কিন্তু পরবর্তীতে অন্যান্য হাদীস দ্বারা এই হাদীসের হুকুম রহিত হয়ে যায়। অর্থাৎ এখন কেউ চাইলে কুরবানির গোশত ফ্রিজে রেখে বা শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে পারে।
  5. কুরবানি দাতা নিজে জবাই না করে অন্য কাউকে দিয়ে জবাই করালে তাকে পারিশ্রমিক দেয়া উচিত। কারণ তিনি ছুড়ি ধার করা, ঝুকি নিয়ে পশু জবাইয়ের কাজটা করেন। এতে যেই পরিশ্রমটা হয় এর মূল্যায়ন আমাদের করা উচিত। মাদরাসার ছাত্ররা পশু জবাই করে দিবে যেন আমরা তাদেরকে কুরবানির পশুর চামড়া দেই, এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা উচিত। পশুর চামড়া পুরোটা তাকে দিলেও সেটা কিন্তু তার সম্পত্তি হয়ে যাচ্ছে না। সেটা যাচ্ছে মাদরাসার ফান্ডে। তাই আমাদের উচিত পশু জবাই বাবদ তাদেরকে সম্মানী দেয়া। তবে কোন ক্রমেই এই সম্মানী চামড়া বা পশুর গোশতের দ্বারা দেয়া যাবে না। একই ভাবে কসাইদেরকেও কুরবানির চামড়া বা গোশতের দ্বারা পারিশ্রমিক দেয়া যাবে না। মেহমান হিসেবে তাদেরকে খাওয়াতে বা উপহার হিসেবে দিলে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু পারিশ্রমিক হিসেবে পশুর দড়িটাও তাদেরকে দেয়া যাবে না।
  6. কুরবানির পশুর গোশত দিয়ে ঈদের দিনের খাওয়া শুরু করা সুন্নাহ।
  7. জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা গেলে শরীরের কোন চুল, পশম বা নখ না কাটা উত্তম। বরং কুরবানির দিন কুরবানি করার পরে এগুলো কাটা সুন্নাহ।
  8. কারো যদি কুরবানি করার সামর্থ না থাকে তাহলে সে জিলহজ্জ মাসের চাঁদ দেখা গেলে শরীরের চুল, লোম বা নখ কাটা থেকে বিরত থাকবে। এবং কুরবানির দিন এগুলো কেটে পরিচ্ছন্ন হবে। এটাই তার জন্য কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে। (আবু দাউদ, নাসায়ী)
  9. ৯ জিলহজ্জ ফজরের নামাজের পর থেকে ১৩ জিলহজ্জ আসরের নামাজ পর্যন্ত সকল প্রাপ্ত বয়ষ্ক নারী-পুরুষের উপর তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা ওয়াজিব। এই ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর অন্তত একবার তাকবিরে তাশরিক পড়তে হবে। পুরুষেরা উচ্চ স্বরে আর নারীরা নিচু স্বরে পড়া উত্তম। জামাত ছুটে গেলে বা এই ২৩ ওয়াক্তের মধ্যে কোন ওয়াক্ত কাযা হলে সেই কাযা নামাজ পড়ার পর তাকবির পাঠ করতে হবে। কোন নামাজের পরে তাকবিরে তাশরিক পড়তে ভুলে গেলে মনে হবার সাথে সাথে তা পড়ে নিতে হবে। তাকবিরে তাশরিক হচ্ছেঃ الله أكبر .. الله أكبر .. لا إله إلا الله ، الله أكبر .. الله أكبر .. ولله الحمد উচ্চারণঃ “আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর, ওয়ালিল্লাহিল হামদ”। অর্থ: “আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান! আল্লাহ ব্যতিত কোনো উপাস্য নেই; এবং আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান! আর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য”।
  10. কুরবানির গোশতের ৩ ভাগের এক ভাগ নিজের জন্য রাখা। বাকি দুই ভাগের ১ ভাগ গরিবদের আর আরেক ভাগ প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব। তবে কারো পরিবারের লোক সংখ্যা বেশি হলে বা যে কোনো কারণেই হোক সকল গোশত নিজে খেতে চাইলে বা পুরোটা দান করে দিলেও কুরবানি আদায় হবে। বা ঠিকঠাক ৩ ভাগ না করে দানের পরিমাণ কম বা বেশি করলেও কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু সুন্নাহ অনুযায়ী বিতরনের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হবে। অমুসলিমদেরকেও কুরবানির গোশত খেতে দেয়া যাবে।
  11. কুরবানির পশুর রক্ত ও অন্যান্য আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা বা মাটি চাপা দেয়া। কোন ক্রমেই যেন পরিবেশ দুর্গন্ধময় না হয়।

আল কোরআনের সূরা সমূহ বাংলা অনুবাদ, ফজিলত, আয়ত, রুকু আরবি ও বাংলা উচ্চারণ

যে সব কারণে কুরবানি শুদ্ধ হবে না / ঈদুল আযহার বর্জনীয় কাজ

  1. গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানি করলে
  2. হারাম উপার্জনের টাকায় কুরবানির পশু ক্রয় করা হলে
  3. ‘আল্লাহ খুশি হবেন, আবার গোশতও খাওয়া হবে’ এমন চিন্তা করে কুরবানি করলে
  4. কুরবানির পশুর ভাগিদারদের মধ্যে কোন একজন ভাগিদারের নিয়তে সমস্যা থাকলে বাকিদের কুরবানিও শুদ্ধ হবে না
  5. ভাগিদারদের মধ্যে কোন একজনেরও যদি পশু কেনার টাকা হারাম উপার্জনের হয়ে থাকে তাহলেও কারো কুরবানি শুদ্ধ হবে না
  6. কুরবানির পশুর গোশত, ভূড়ি, চর্বি ইত্যাদি কোনো কিছুই বিক্রি করা যাবে না। চামড়া বা চর্বি অনেকে বিক্রি করেন। সেক্ষেত্রে পুরো টাকাটাই গরিবদের দান করে দিতে হবে
  7. যেখানে জুমা ও ঈদের নামাজ ওয়াজিব সেখানে জিলহজ্জের ১০ তারিখ ঈদুল আযহার নামাজের আগে কুরবানি করলে কুরবানি আদায় হবে না
  8. জিলহজ্জ মাসের ১২ তারিখ মাগরিবের আগ পর্যন্ত কুরবানী করা যায়। ১২ তারিখ মাগরিবের পরে কুরবানি করলে কুরবানি আদায় হবে না
  9. ‘বড় গরু কুরবানি না দিলে কি ইজ্জত থাকে?’ এমন লোক দেখানো মনোভাবের কারণেও কুরবানি শুদ্ধ হবে না
  10. ‘গরুটা কিন্যা জিতছি’ বা “গরুটা কিন্যা ঠগা হইছে” এই রকম মন্তব্য করা বা মনে আনাও অনুচিত। কারণ কুরবানি আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। যা লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে
  11. “গরুর দাম এত টাকা। মোট গোশত হইছে এত কেজি। তার মানে প্রতি কেজির দাম পড়ছে এত টাকা” এই ধরণের হিসাব-নিকাশ করতেও ওলামাগণ নিষেধ করে থাকেন। কুরবানির গোশতের দাম বের করা, বাজারের গোশতের দামের সাথে তুলনা করে লাভ-লোকসানের চিন্তা করাটা সম্ভবত দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক। এজন্য আমাদের সাথে কুরবানি দেয়া একজন মসজিদের ইমাম ও খতিব সাহেব ভাগের গোশতের ওজন হিসাব রাখতেন না। আমরা গোশত কাটা চলাকালীন সময়েই ওজন দিয়ে সব ভাগীদারদের ২-৩ কেজি করে বন্টন করতে থাকতাম। এতে সকল ভাগীদার সমান পরিমানে গোশত পান কিন্তু এক্সাক্ট হিসাব রাখা কষ্টকর হয় যে ঠিক কত কেজি গোশত পাওয়া গেল।
  12. “এইবারের গরুর গোশতটা জানি ক্যামন? খুব একটা খাইতে পারি নাই” বা “গোশত যা খাওয়া খাইছি!!!” অথবা “ভাই গোশত খাইলেন ক্যামন?” এই ধরণের কথাগুলোও সম্ভবত কুরবানির দর্শনের পরিপন্থি
  13. বাড়িতে জ্বীন বা শয়তান প্রবেশ করবে না এই উদ্দেশ্যে কুরবানির পশুর রক্ত বাড়ির চারিদিকে ছিটানো একটি মনগড়া কাজ। বা গাছে কুরবানির পশুর মাথার হাড় বা শিং ঝুলিয়ে রাখা। এগুলোর কোনটিই ইসলামের সহিহ দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়

কুরবানির গরুতে আক্বিকা দেয়া যাবে কিনা?

আক্বিকা একজন পিতার প্রতি একজন শিশুর একটি হক্ব বা অধিকার। এর মাধ্যমে শিশুর বিপদ-আপদ দূর হয় এবং কল্যানের রাস্তা সুপ্রশস্ত হয়। আক্বিকা করার সুন্নাহ নির্দেশিত সময় হচ্ছে শিশুর জন্মের ৭ম দিনে। শিশু জন্মের সপ্তম দিনে ছেলে শিশুর জন্য ২টি ছাগল ও মেয়ে শিশুর জন্য একটি ছাগল জবাই দেয়ার মাধ্যমে পিতা তার সন্তানের আক্বিকা করবেন। কোনো পিতার ক্ষেত্রে এটা উচিত নয় শিশুর এই হক্বটি ৭ম দিনের পর বিলম্বিত করা। বরং আগে থেকেই প্রিপারেশন রাখা উচিত যেন, জন্মের ৭ম দিনে আক্বিকা আদায় করা যায়। আক্বিকার জন্য অনেক বড় আয়োজন, অনুষ্ঠান করা জরুরি নয়। জন্মের ৭ম দিনে আল্লাহর নামে ছাগল জবাই দেয়ার মাধ্যমে আক্বিকা করাই সুন্নাহ। এর গোশত শিশুর বাবা-মা ও তার পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবে, আত্মীয়-স্বজনদের হাদিয়া দিতে পারবে এবং গরিবদের মাঝে বিতরণ করতে পারবে। অতএব দেখা যাচ্ছে, আক্বিকার উত্তম ও মাসনুন সময় হচ্ছে শিশুর জন্মের দিনের সাথে সম্পর্কিত। কুরবানির ঈদের দিনের সাথে সম্পর্কিত নয়। তাই আমাদের উচিত হবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, যেন শিশু জন্মের ৭ম দিনেই আকিকা দিতে পারি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কুরবানির গরুতে ৭টি ভাগের মধ্যে কিছু কুরবানি ও কিছু আক্বিকা একত্রে করা যাবে কিনা? অর্থাৎ একই গরুতে কুরবানি ও আক্বিকা দেয়া যাবে কিনা?

উত্তর হচ্ছেঃ কোনো কারণে শিশুর পিতা যদি পিতা সময়ে আক্বিকা দিতে অপারগ হন। তাহলে যখন সামর্থ্য হবে তখনই তিনি তা আদায় করতে পারেন। সে হিসাবে কুরবানির সময় কুরবানির গরুর সাথে আক্বিকা করলে সেটি জায়েজ আছে। কিন্তু এটি সুন্নাহ নয়। এছাড়াও আক্বিকার ক্ষেত্রে একটি সুন্নাহ হলো ছাগল দিয়ে আক্বিকা দেয়া। কুরবানির গরুতে আক্বিকা দেয়া হলে এই সুন্নাহের উপর আমল হয় না।

কুরবানির গরুতে আক্বিকাও শুদ্ধ হবে এটা হানাফী ফিকহের মাসআলা। তার মানে এই নয় যে, হানাফী ফিকহের মাঝে আক্বিকাকে বিলম্বিত করে কুরবানির সাথে একত্রিত করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। বরং হানাফী মাজহাবের সকল আলেমগণই সুন্নাহের আলোকে শিশু জন্মের ৭ম দিনে আক্বিকা করার বিষয়ে জোর দেন। কিন্তু কোনো কারণে তা সম্ভব না হলে কুরবানির সাথে আদায় করলেও আদায় হয়ে যাবে, এরকম একটা অপশনের ব্যাপারে তারা বলেছেন।

উক্ত মাসআলার ব্যাপারে অন্য মাজহাবের ইমাম ও স্কলারদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই আপনি হানাফি ফিকহ ব্যতীত অন্য ফিকহী মাজহাব অনুসরণ করলে, কুরবানির পশুতে আক্বিকার ভাগ দেয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন।

কুরবানির গরুতে ভাগের সংখ্যা কি বিজোড় সংখ্যায় হতে হবে?

গরু কুরবানির ক্ষেত্রে একটা miss conception আছে অনেকের মধ্যে যে, ভাগ হতে হবে বিজোড় সংখ্যায়। ১, ৩, ৫ বা ৭ এরকম। এ ধারনাটা সঠিক নয়। একটা গরু ১ জনের পক্ষ থেকে কুরবানি করা যেতে পারে। একই ভাবে ২ জন, ৩ জন, ৪ জন, ৫ জন, ৬ জন বা ৭ জনের পক্ষ থেকেও কুরবানি করা যাবে। এক্ষেত্রে বিজোড় সংখ্যায় কুরবানির ভাগ হওয়ার কোনো বিশেষ ফজিলত বা সওয়াব নাই।

গরু-মহিষ এ জাতীয় পশুতে ভাগের ক্ষেত্রে কারো দেড় ভাগ, কারো সাড়ে তিন ভাগ এরকম ভাবে ভাঙা যাবে না। ভাগের সংখ্যা পূর্ণ সংখ্যায় হতে হবে।

কোথাও কোথাও দেখা যায় ২-৩ জন মিলে এক ভাগ কুরবানির টাকা জমা করে কুরবানি দেয়া হয়। যেমনঃ ৩ ভাই বা বন্ধু মিলে ৯ হাজার টাকা একত্র করলো। এরপর একটা গরুর ৭ ভাগের ১ ভাগ নিল উক্ত ৯ হাজার টাকায়। আর ৩ জনেই নিজ নিজ কুরবানির নিয়ত করল। এতে কুরবানি শুদ্ধ হবে না। এরকম করতে হলে কুরবানির এই ৯ হাজার টাকা কোনো একজনকে মালিক বানিয়ে দিতে হবে। এরপর সেই ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে কুরবানি করবেন। কিন্তু গরুর ৭ ভাগের ১ ভাগকে আবার একাধিক ব্যক্তি মিলে শেয়ার করলে তা শুদ্ধ হবে না।

কুরবানির পশু জবাইয়ের পর শরীকদের নাম উচ্চারণ করা কতটা জরুরি?

আয়েশা রা. থেকে অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে জবাই করেছেন এবং বলেছেন-

اللهُمّ تَقَبّلْ مِنْ مُحَمّدٍ، وَآلِ مُحَمّدٍ، وَمِنْ أُمّةِ مُحَمّدٍ.

হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে, মুহাম্মাদের পরিবারের পক্ষ থেকে এবং মুহাম্মাদের উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করুন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬৭; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯২

আরেক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

بِسْمِ اللهِ مِنْكَ وَلَكَ اللهُمّ تَقَبّلَ مِنْ مُحَمّدٍ.

আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ! তোমার নিকট থেকে এবং তোমার উদ্দেশ্যে। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। -আল মুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১১৩২৯

এই হাদীসগুলো থেকে বুঝা গেল, কুরবানীর পশু জবাই করার পর তা কবুলের জন্য আল্লাহর দরবারে উক্ত পদ্ধতিতে দুআ করা মুস্তাহাব। এক্ষেত্রে নিজের নাম উল্লেখ করবে। যাদের জন্য ঈসালে সওয়াব করতে চাচ্ছে, তাদের নামও উল্লেখ করবে।

তবে এই নাম উল্লেখ করা নিয়ে খুব বেশি সিরিয়াস হওয়ার কিছু নাই। এমনটা মনে করার কারণ নাই যে জবাইয়ের পর সকলের নাম, বাবার নাম পাঠ না করলে কুরবানিই হবে না। আল্লাহ আমাদের মনের অবস্থা জানেন, আমাদের সকলের নিয়ত জানেন। কুরবানি দেয়ার উদ্দেশ্যে যখন হাট থেকে গরু কেনা হয়েছে সেটাই আমাদের নিয়তের জন্য যথেষ্ট।

সমাজে প্রচলিত আছে যে কাগজে ৭ জনের নাম লিখা হয়, পুরুষের ক্ষেত্রে তাদের বাবার নাম লিখা হয়। নারীদের ক্ষেত্রে স্বামীর নাম লিখা হয়। এরপর হুজুরকে দিয়ে জবাই দেয়ার পর পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে সবার নাম, বাবার নাম, স্বামীর নাম পড়ানো হয়। যিনি জবাই করবেন তার ব্যস্ততা থাকুক বা অন্য গরু জবাইয়ের তাড়া থাকুক না কেন সবাইকে শুনিয়ে জোরে জোরে নাম না পড়লে অনেকের মন প্রশান্ত হয় না। এটা অহেতুক বাড়াবাড়ি। যিনি আপনার পক্ষ থেকে জবাই করবেন তিনি নাম না পড়লে এমন কি তিনি যদি নাও জানেন যে এটা কার কুরবানি তাতেও কোনো সমস্যা নাই।

অনেক সময় দেখা যায় গরু শোয়ানো হয়ে গেছে, কিন্তু ৭ শরীকের নামের লিস্ট পাওয়া যাচ্ছে না দেখে জবাই করা হচ্ছে না। পশুকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে ঐ লিস্ট জোগাড় করার জন্য। এটা অনুচিত। যদি লিস্ট অনুযায়ী সবার নাম পড়তেই হয় তাহলে আগে থেকে লিস্ট রেডি করা উচিত। কিন্তু কোনো কারণে সেই লিস্ট করা না হলে বা যিনি জবাই করছেন তার তাড়া থাকলে মনের মধ্যে কোনো সংশয় রাখার প্রয়োজন নাই যে “আমার তো নাম পড়া হলো না, আমার কুরবানি কি হবে?” কুরবানি আদায় হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। এটাই আলেমদের বিশুদ্ধতম মত।

কুরবানির দিন মোরগ-মুরগি জবাই নিয়ে একটি বানোয়াট রেওয়াজ

আমাদের গ্রামে (মানিকগঞ্জ জেলায়) কুরবানির দিন কোন বাড়িতে হাস-মুরগি জবাই করা কঠিন ভাবে নিষেধ। গ্রামের মুরুব্বিরা তাদের মুরুব্বিদের থেকে শুনে এসেছেন “কুরবানির দিন দো পায়া জানোয়ার জবাই করা নিষেধ”। কারণ হিসেবে তারা মনে করেন ইসমাঈল (আঃ) মানুষ ছিলেন, তাঁর ছিল দুই পা। আর হাস-মুরগিরও দুই পা। তাই হাস-মুরগি জবাই করলে তা ইসমাঈল (আঃ) এর দিকেই ধাবিত হয় (নাউযুবিল্লাহ)। এই ধারনাটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। কুরআন-হাদীসের কোথাও এরকম নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ নাই।

কোথাও কোথাও প্রচলিত আছে আরেকটা ভয়ংকর রেওয়াজ। যারা গরিব বা কুরবানির সামর্থ নাই, তারা কুরবানির নিয়তে মোরগ জবাই দিয়ে থাকে। এটাও সম্পূর্ণ নাজায়েজ একটি কাজ। কুরবানির নিয়তে গরু, ছাগল, উট, দুম্বা, ভেড়া, মহিষ ব্যাতিত অন্য কোন পশু কুরবানি জায়েজ নাই।

ঈদের দিন সকলেই ভাল খাবার খেতে চায়। সে হিসেবে হাস-মুরগি জবাই করে খাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু মনের মধ্যে এই নিয়ত রাখা যাবে না যে “আমি যেহেতু কুরবানি দিতে পারছি না, তাই মুরগি জবাই করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য”

অতএব কুরবানির ঈদের দিন আমরা হাস-মুরগি-কবুতর ইত্যাদি জবাই করে খাওয়াকে নিষেধ বা খারাপ কাজ মনে করব না। প্রয়োজন হলে অবশ্যই ঈদের দিন এগুলো জবাই করে খাওয়া যাবে। এতে কোনো গুনাহ নাই। অপর পক্ষে, কুরবানি করার সামর্থ্য না থাকলে কুরবানির নিয়তে মোরগ জবাই করার কাজ থেকে বিরত থাকব। কারণ গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া ইত্যাদি ব্যতিত হাস-মুরগি জাতীয় কোনো প্রাণী দিয়ে কুরবানি করা জায়েজ নেই।

কুরবানির চামড়া দিয়ে কী করব?

কুরবানির পশুর চামড়া কেউ যদি চায় শুকিয়ে প্রকৃয়াজাত করে নিজে ব্যবহার করতে পারবে। পশুর চামড়া খাওয়াও হালাল। গরুর চামড়া প্রসেসিং করে ভূড়ির মত করে এটাকে খাওয়ায় যায়। কিন্তু চামড়া বিক্রি করলে সেই টাকা নিজে ব্যবহার করতে পারবে না, বরং গরিবদেরকে দান করে দিতে হবে। যেহেতু আমাদের দেশে কেউ সাধারণত নিজে চামড়া প্রকৃয়াজাত করে ব্যবহার করে না। তাই সাধারণত এটা বিক্রি করে এর মূল্য দান করা হয় গরিব-মিসকিনদেরকে। চামড়ার মূল্য দান করার খাত যাকাতের অর্থ দান করার খাতের অনুরূপ। অর্থাৎ যারা যাকাতের অর্থ খাওয়ার অধিকার রাখে তারাই কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য পাওয়ার অধিকার রাখে। বেশির ভাগ সময় সবাই চেষ্টা করে কুরবানির পশুর চামড়া কোন মাদরাসায় দান করে দিতে। কেননা মাদরাসায় অনেক এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থী থাকে যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব মাদরাসাগুলো নিয়ে থাকে।

সম্ভবত ২০১৮-২০১৯ সাল থেকে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে রাখা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে দেখা গিয়েছে অনেকেই চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে গিয়েছে বা মাটিতে পুতে ফেলেছে। মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর আয়ের বড় একটা উৎস এই কুরবানির চামড়া। কাচা চামড়ার এই অস্বাভাবিক কম মূল্যের জন্য মাদরাসাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় বলে মনে করছি। তাই অনুরোধ থাকবে আপনার পশুর চামড়া এলাকার মাদরাসার এতিমখানা বা লিল্লাহ ফান্ডে দান করে দিবেন। যেন এর বিক্রয়লব্ধ অর্থ গরিব-মিসকিন ছাত্রদের কল্যানে ব্যয় করা যায়।

কুরবানির দিন এলাকায় কিছু সিজনাল চামড়া ব্যবসায়ীদের আনাগোনা দেখা যায়। যারা সাধারনত হয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। যারা এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করে কুরবানির চামড়া খুব কম মূল্য দিয়ে জোর পূর্বক কিনে নেয়। গত কয়েক বছরে চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ার কারণে এই সন্ত্রাসী বাহিনীর দৌরাত্ম হয়ত আগের মত দেখা যায় না। আগে এক সময় দেখা যেত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঈদের দিন এরা মহড়া দিত। যাদের মূল উদ্দেশ্য থাকত মাদরাসার কোনো ছাত্র যেন চামড়া কিনতে বা দান হিসাবে নিতে না পারে। এটা খুবই লজ্জাজনক একটা কাজ। যেই চামড়া বিক্রির টাকা গরিব-মিসকিনদের হক্ব। সেখানে তাদেরকে বঞ্চিত করে এই রাজনৈতিক সিজনাল চামড়া ব্যবসায়ীরা।

অনেক সময় দেখা যায় মাদরাসার ছাত্ররা গরুর একটি চামড়া কেনার জন্য ২০০ টাকা দিতে চায়। অপর পক্ষে অন্যান্য ব্যবসায়ীরা বা উপরে উল্লেখিত সোনার ছেলেরা হয়ত ৫০০ টাকা দিতে চায়। এক্ষেত্রে আমি ২০০ টাকার বিনিময়ে মাদরাসার ছাত্রের কাছেই চামড়াটি বিক্রি করব। কারণ মাদরাসা ঐ চামড়াটি ২০০ টাকায় কিনে হয়ত ১০০০ টাকায় বিক্রি করবে। ফলে মাদরাসা ৮০০ টাকা লাভ করতে পারবে। ফলে গরিবের হক্ব আদায় হবে এই ৮০০ টাকা এবং আমার হাতে পাওয়া ২০০ টাকা। কারণ এই ২০০ টাকাও আমাকে কোনো না কোনো গরিবকে দান করতে হবে। এতে করে গরিবরা দান হিসাবে মোট ১০০০ টাকা পাবে। অপর দিকে আমি যদি ৫০০ টাকায় চামড়াটি কোনো ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করি। তাহলে এই ৫০০ টাকা আমি গরিবদের দান করতে পারব। আর ঐ ব্যবসায়ী চামড়াটি ১০০০ টাকায় বিক্রি করে ৫০০ টাকা লাভ করতে পারবে। এতে ঐ ব্যবসায়ী বেশি লাভবান হলো। গরিবের হক্ব আদায় হলো মাত্র ৫০০ টাকা।

আমাদের ব্যবসায় যেহেতু আল্লাহর সাথে। তাই আসুন, কোন দিক দিয়ে হিসাব করলে গরিবের বেশি লাভ হবে সেটা নিয়ে ভাবি। কিভাবে মাদরাসা বা এতিমখানাকে একটু বেশি লাভবান করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখি। ভাল হয় যদি কোন মাদরাসায় পুরো চামড়াটা দান করে দিতে পারি। অথবা মাদরাসার কাছে নাম মাত্র মূল্যে বিক্রি করি। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত, দরিদ্রদের এই হকটা তারাই যেন পায়।

আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার  মরন বিশ্ব-প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। (সূরা আন’আম – ১৬২)

আল্লাহ আমাদের সকলকে কুরবানি করার তৌফিক দিন। আমাদের সকলের কুরবানি কবুল করুন। আমীন।

[বিঃ দ্রঃ এটা আমার কোন মৌলিক লেখা নয়। কিছু তথ্যের সন্নিবেশ করেছি মাত্র। কোথাও কোন তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে জানাবেন। আমি ভুলগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।]

প্রশ্ন ও মতামত জানাতে পারেন আমাদের কে ইমেল : info@banglanewsexpress.com

আল কোরআনের সূরা সমূহ বাংলা অনুবাদ, ফজিলত, আয়ত, রুকু আরবি ও বাংলা উচ্চারণ

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)

islamicinfohub Top Post Ad1

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top