সূরা ইউসুফ বাংলা উচ্চারণ সহ অনুবাদ,সূরা তাওবা বাংলা উচ্চারণ, সূরা আল ইউসুফ বাংলা তরজমা,সূরা ইউসুফ বাংলা তাফসীর, আমল সূরা আল ইউসুফ, সকল আমল সূরা আল ইউসুফ

0

 

১২ . ইউসুফ - ( يوسف ) | নবী ইউসুফ (আঃ)

মাক্কী, মোট আয়াতঃ ১১১


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ


الر ۚ تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আলিফ-লাম-রা। এগুলো সত্যকে পরিস্ফুটনকারী কিতাবের আয়াত।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আলিফ-লা-ম-রা; এগুলো সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আলিফ-লাম-রা; এইগুলি সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত।



إِنَّا أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আমি একে আরবী ভাষার কুরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এটা আমিই অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পার।


আরো পড়ুন :-

স্মরণ শক্তি বৃদ্ধির দোয়া,মেধা বৃদ্ধির দোয়া,স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর দোয়া!নামাজের পর ২১ বাড় পড়ুন

দোয়াটি পড়লে সাথে সাথে রাগ কমে যায়, রাগ কমানোর দোয়া,শিশুদের রাগ কমানোর আমল

(ads1)

(getButton) #text=(আল কোরআন বাংলা অনুবাদ ) #file=(Al Quran Bangla) #icon=(download) #size=(25) #color=(#d10404) #info=(PDF Download)



نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هَـٰذَا الْقُرْآنَ وَإِن كُنتَ مِن قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَافِلِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(হে নবী!) আমি ওহী মারফত এই যে কুরআন তোমার কাছে পাঠিয়েছি, এর মাধ্যমে তোমাকে এক উৎকৃষ্টতম ঘটনা শোনাচ্ছি, যদিও তুমি এর আগে এ সম্পর্কে (অর্থাৎ এ ঘটনা সম্পর্কে) বিলকুল অনবহিত ছিলে।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করেছি, যেমতে আমি এ কোরআন তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছি। তুমি এর আগে অবশ্যই এ ব্যাপারে অনবহিতদের অন্তর্ভূক্ত ছিলে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি, ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন প্রেরণ করে; যদিও এটার পূর্বে তুমি ছিলে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত।



إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(এটা সেই সময়ের কথা,) যখন ইউসুফ নিজ পিতা (ইয়াকুব আলাইহিস সালাম) কে বলেছিল, আব্বাজী! আমি (স্বপ্নযোগে) এগারটি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্রকে দেখেছি। আমি দেখেছি তারা সকলে আমাকে সিজদা করছে।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যখন ইউসুফ পিতাকে বললঃ পিতা, আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারটি নক্ষত্রকে। সুর্যকে এবং চন্দ্রকে। আমি তাদেরকে আমার উদ্দেশে সেজদা করতে দেখেছি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

স্মরণ কর, ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিল, ‘হে আমার পিতা! আমি তো দেখেছি একাদশ নক্ষত্র, সূর্য এবং চন্দ্রকে; দেখেছি এদেরকে আমার প্রতি সিজ্দাবনত অবস্থায়।’



قَالَ يَا بُنَيَّ لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَىٰ إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا ۖ إِنَّ الشَّيْطَانَ لِلْإِنسَانِ عَدُوٌّ مُّبِينٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সে বলল, বাছা! নিজের এ স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা করো না, পাছে তারা তোমার বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্র করে। কেননা শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। ১


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি বললেনঃ বৎস, তোমার ভাইদের সামনে এ স্বপ্ন বর্ণনা করো না। তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘হে আমার বৎস! তোমার স্বপ্ন-বৃত্তান্ত তোমার ভাইদের নিকট বর্ণনা কর না; করলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’


তাফসীরঃ

১. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার ব্যাখ্যা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের জানা ছিল। তার ব্যাখ্যা ছিল এই যে, এক সময় হযরত ইউসুফ আলাইহিস অতি উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন। ফলে এমনকি তার এগার ভাই ও পিতা-মাতা তার বাধ্য ও অনুগত হয়ে যাবে। অপর দিকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সর্বমোট পুত্র ছিল বারজন। তার মধ্যে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও বিনইয়ামীন ছিলেন এক মায়ের এবং অন্যরা অন্য মায়ের। হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের আশঙ্কা ছিল এ স্বপ্নের কথা শুনলে সৎ ভাইয়েরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তে পারে এবং শয়তানের প্ররোচনায় তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারে।



وَكَذَٰلِكَ يَجْتَبِيكَ رَبُّكَ وَيُعَلِّمُكَ مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ وَيُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَعَلَىٰ آلِ يَعْقُوبَ كَمَا أَتَمَّهَا عَلَىٰ أَبَوَيْكَ مِن قَبْلُ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ ۚ إِنَّ رَبَّكَ عَلِيمٌ حَكِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আর এভাবেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে (নবুওয়াতের জন্য) মনোনীত করবেন ২ এবং তোমাকে সকল কথার সঠিক মর্মোদ্ধার শিক্ষা দেবেন (স্বপ্নের তাবীর জানাও তার অন্তর্ভুক্ত) এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের সন্তানদের প্রতি নিজ অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে ইতঃপূর্বে তিনি পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃদ্বয়- ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এমনিভাবে তোমার পালনকর্তা তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন এবং পূর্ণ করবেন স্বীয় অনুগ্রহ তোমার প্রতি ও ইয়াকুব পরিবার-পরিজনের প্রতি; যেমন ইতিপূর্বে তোমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্ণ করেছেন। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তা অত্যন্ত জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়া‘ক‚বের পরিবার-পরিজনের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি এটা পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি। নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


তাফসীরঃ

২. অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যেমন এ স্বপ্নের মাধ্যমে তোমাকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, সকলে তোমার অনুগত হয়ে যাবে, তেমনি তিনি নবুওয়াত দানের মাধ্যমে তোমাকে আরও বহু নি‘আমতে পরিপ্লুত করে তুলবেন।



۞ لَّقَدْ كَانَ فِي يُوسُفَ وَإِخْوَتِهِ آيَاتٌ لِّلسَّائِلِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

প্রকৃতপক্ষে যারা (তোমার কাছে এ ঘটনা) জিজ্ঞেস করছে, তাদের জন্য ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের ঘটনায় আছে বহু নিদর্শন। ৩


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অবশ্য ইউসুফ ও তাঁর ভাইদের কাহিনীতে জিজ্ঞাসুদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ এবং তার ভাইদের ঘটনায় জিজ্ঞাসুদের জন্যে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।


তাফসীরঃ

৩. বাহ্যত এর দ্বারা সেই কাফেরদের প্রতি ইশারা করা হয়েছে, যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিল, বনী ইসরাঈল ফিলিস্তিন ছেড়ে মিসরের অভিবাসী হয়েছিল কেন? তাদের এ প্রশ্নের আসল উদ্দেশ্য তো ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লা-জবাব করা। তারা মনে করেছিল তিনি উত্তর দিতে সক্ষম হবেন না। আল্লাহ তাআলা বোঝাচ্ছেন যে, তাদের প্রশ্ন দূরভিসন্ধিমূলক হলেও এ ঘটনার ভেতর তাদের জন্য বহু শিক্ষা রয়েছে যদি তারা আকল-বুদ্ধিকে কাজে লাগায়। (এক) প্রথমত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মুখে এ ঘটনাটি বিবৃত হওয়া তাঁর নবুওয়াতের এক সাক্ষাৎ প্রমাণ। এটাই কি কিছু কম শিক্ষা? (দুই) হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে যত চক্রান্ত করা হয়েছে, সে চক্রান্তের হোতা তাঁর ভাইয়েরা হোক বা যুলায়খা ও তার সখীরা, শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটিরই মুখোশ খুলে গেছে এবং চূড়ান্ত বিজয় ও অভাবিতপূর্ব সম্মান হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামেরই নসীব হয়েছে।



إِذْ قَالُوا لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَىٰ أَبِينَا مِنَّا وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّ أَبَانَا لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(এটা সেই সময়ের ঘটনা) যখন ইউসুফের (সৎ) ভাইগণ (পরস্পরে) বলেছিল, নিশ্চয়ই আমাদের পিতার কাছে আমাদের তুলনায় ইউসুফ ও তার (সহোদর) ভাই (বিনইয়ামীনই) বেশি প্রিয়, অথচ আমরা (তার পক্ষে) একটি সুসংহত দল। ৪ আমাদের বিশ্বাস যে, আমাদের পিতা সুস্পষ্ট কোনও বিভ্রান্তিতে নিপতিত।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যখন তারা বললঃ অবশ্যই ইউসুফ ও তাঁর ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চাইতে অধিক প্রিয় অথচ আমরা একটা সংহত শক্তি বিশেষ। নিশ্চয় আমাদের পিতা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে রয়েছেন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

স্মরণ কর, এরা বলেছিল, ‘আমাদের পিতার নিকট ইউসুফ এবং তার ভাইই আমাদের অপেক্ষা অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে।


তাফসীরঃ

৪. অর্থাৎ, আমাদের যেমন বয়স ও শক্তি বেশি, তেমনি আমরা সংখ্যায়ও অধিক। সে কারণে আমরা পিতার বাহুবলও বটে। তাঁর যখন কোন সাহায্যের দরকার হয়, তখন আমরাই তাঁর সাহায্য করার ক্ষমতা রাখি। সুতরাং তাঁর উচিত আমাদেরকেই বেশি মহব্বত করা।



اقْتُلُوا يُوسُفَ أَوِ اطْرَحُوهُ أَرْضًا يَخْلُ لَكُمْ وَجْهُ أَبِيكُمْ وَتَكُونُوا مِن بَعْدِهِ قَوْمًا صَالِحِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(সুতরাং এর সমাধান এই যে,) তোমরা ইউসুফকে হত্যা করে ফেল অথবা তাকে অন্য কোনও স্থানে ফেলে আস, যাতে তোমাদের পিতার সবটা মনোযোগ কেবল তোমাদেরই দিকে চলে আসে। আর এসব করার পর তোমরা (তাওবা করে) ভালো লোক হয়ে যাবে। ৫


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হত্যা কর ইউসুফকে কিংবা ফেলে আস তাকে অন্য কোন স্থানে। এতে শুধু তোমাদের প্রতিই তোমাদের পিতার মনোযোগ নিবিষ্ট হবে এবং এরপর তোমরা যোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর বা তাকে কোন স্থানে ফেলিয়া আস, ফলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি শুধু তোমাদের প্রতিই নিবিষ্ট হবে এবং তার পর তোমরা ভাল লোক হয়ে যাবে।’


তাফসীরঃ

৫. এ তরজমা করা হয়েছে আয়াতের একটি তাফসীর অনুযায়ী। যেন তাদের ধারণা ছিল গুনাহ তো বড়জোর একটাই হবে! আর তাওবা দ্বারা যে-কোনও গুনাহই মাফ হয়ে যায়। সুতরাং এটা করার পর তোমরা তাওবা করে নিও, তারপর সারা জীবন ভালো হয়ে চলো। অথচ কারও উপর জুলুম করা হলে সে গুনাহ কেবল তাওবা দ্বারাই মাফ হয় না; বরং স্বয়ং মজলুম কর্তৃক ক্ষমা করাও জরুরী। এ বাক্যটির আরও এক তাফসীরও হতে পারে। তা এই যে, এর দ্বারা তারা পরে তাওবা করে ভালো হয়ে যাওয়ার কথা বোঝাতে চায়নি; বরং এর অর্থ হচ্ছে এসব করার পর তোমাদের সব ব্যাপার ঠিক হয়ে যাবে। অর্থাৎ, পিতার পক্ষ হতে কারও প্রতি পৃথক আচরণের কোনও সম্ভাবনা থাকবে না। কুরআন মাজীদের শব্দমালার প্রতি লক্ষ্য করলে এ তরজমারও অবকাশ আছে।


১০


قَالَ قَائِلٌ مِّنْهُمْ لَا تَقْتُلُوا يُوسُفَ وَأَلْقُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ يَلْتَقِطْهُ بَعْضُ السَّيَّارَةِ إِن كُنتُمْ فَاعِلِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তাদের মধ্যে একজন বলল, ইউসুফকে হত্যা করো না। বরং তোমরা যদি কিছু করতেই চাও, তবে তাকে কোনও গভীর কুয়ায় ফেলে দাও, যাতে কোন কাফেলা তাকে তুলে নিয়ে যায়।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, তোমরা ইউসুফ কে হত্যা করো না, বরং ফেলে দাও তাকে অন্ধকূপে যাতে কোন পথিক তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়, যদি তোমাদের কিছু করতেই হয়।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এদের মধ্যে একজন বলল, তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর না এবং যদি কিছু করতেই চাও তবে তাকে কোন ক‚পের গভীরে নিক্ষেপ কর, যাত্রীদলের কেউ তাকে তুলে নিয়ে যাবে।’


১১


قَالُوا يَا أَبَانَا مَا لَكَ لَا تَأْمَنَّا عَلَىٰ يُوسُفَ وَإِنَّا لَهُ لَنَاصِحُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(সুতরাং) তারা (তাদের পিতাকে) বলল, আব্বা! আপনার কী হল যে, আপনি ইউসুফের ব্যাপারে আমাদের উপর বিশ্বাস রাখেন না? অথচ এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, আমরা তার পরম শুভাকাক্সক্ষী? ৬


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ পিতাঃ ব্যাপার কি, আপনি ইউসুফের ব্যাপারে আমাদেরকে বিশ্বাস করেন না ? আমরা তো তার হিতাকাংখী।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, “হে আমাদের পিতা! ইউসুফের ব্যাপারে তুমি আমাদেরকে বিশ্বাস করছো না কেন, অথচ আমরা তো তার শুভাকাক্ষী ?


তাফসীরঃ

৬. অনুমান করা যায় যে, ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর ভাইয়েরা এর আগেও নিজেদের সঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাতে সম্মতি দেননি।


১২


أَرْسِلْهُ مَعَنَا غَدًا يَرْتَعْ وَيَلْعَبْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে (বেড়াতে) পাঠান। সে খাবে-দাবে এবং ক্ষাণিকটা খেলাধুলা করবে। বিশ্বাস করুন, আমরা তাকে হেফাজত করব।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন-তৃপ্তিসহ খাবে এবং খেলাধুলা করবে এবং আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষন করব।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘তুমি আগামীকাল তাকে আমাদের সঙ্গে প্রেরণ কর, সে তৃপ্তি সহকারে খাবে ও খেলাধুলা করবে। আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব।’


১৩


قَالَ إِنِّي لَيَحْزُنُنِي أَن تَذْهَبُوا بِهِ وَأَخَافُ أَن يَأْكُلَهُ الذِّئْبُ وَأَنتُمْ عَنْهُ غَافِلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইয়াকুব বলল, তোমরা তাকে নিয়ে গেলে আমার (বিরহজনিত) কষ্ট হবে ৭ এবং আমার এই ভয়ও আছে যে, কখনও তার প্রতি তোমরা অমনোযোগী হলে নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলবে। ৮


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি বললেনঃ আমার দুশ্চিন্তা হয় যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি যে, ব্যাঘ্র তাঁকে খেয়ে ফেলবে এবং তোমরা তার দিক থেকে গাফেল থাকবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘এটা আমাকে অবশ্যই কষ্ট দিবে যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশংকা করি তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে, আর তোমরা তার প্রতি অমনোযোগী থাকবে।’


তাফসীরঃ

৭. কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম স্বপ্নে দেখেছিলেন একটি নেকড়ে বাঘ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের উপর আক্রমণ করছে। সেই স্বপ্ন-জনিত আশঙ্কাই তাঁর এ কথায় প্রকাশ পেয়েছে।


৮. অর্থাৎ, অন্য কোন বিপদ না ঘটলেও সে যদি আমার চোখের আড়াল হয়, সেটাও আমার জন্য পীড়াদায়ক হবে। বোঝা গেল বিশেষ প্রয়োজন না হলে প্রিয় সন্তানের দূর গমন পিতা-মাতার পছন্দ নয়। কারণ তাতে তাদের মানসিক কষ্ট হয়।


১৪


قَالُوا لَئِنْ أَكَلَهُ الذِّئْبُ وَنَحْنُ عُصْبَةٌ إِنَّا إِذًا لَّخَاسِرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, আমরা একটি সুসংহত দল হওয়া সত্ত্বেও যদি নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলে, তবে তো আমরা বিলকুল শেষ হয়ে গেছি।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ আমরা একটি ভারী দল থাকা সত্ত্বেও যদি ব্যাঘ্র তাকে খেয়ে ফেলে, তবে আমরা সবই হারালাম।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘আমরা একটি সংহত দল হওয়া সত্ত্বেও যদি নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলে, তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তই হব।’


১৫


فَلَمَّا ذَهَبُوا بِهِ وَأَجْمَعُوا أَن يَجْعَلُوهُ فِي غَيَابَتِ الْجُبِّ ۚ وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ لَتُنَبِّئَنَّهُم بِأَمْرِهِمْ هَـٰذَا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

অতঃপর তারা যখন তাকে সাথে নিয়ে গেল আর তারা তো সিদ্ধান্ত স্থির করেছিল তাকে গভীর কুয়ায় নিক্ষেপ করবে (সেমতে তারা নিক্ষেপও করল), তখন আমি ইউসুফের কাছে ওহী পাঠালাম, (একটা সময় আসবে, যখন) তুমি তাদেরকে অবশ্যই জানাবে যে, তারা এই কাজ করেছিল ৯ আর তখন তারা বুঝতেই পারবে না (যে, তুমি কে?)।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর তারা যখন তাকে নিয়ে চলল এবং অন্ধকূপে নিক্ষেপ করতে একমত হল এবং আমি তাকে ইঙ্গিত করলাম যে, তুমি তাদেরকে তাদের এ কাজের কথা বলবে এমতাবস্থায় যে, তারা তোমাকে চিনবে না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর এরা যখন তাকে নিয়ে গেল এবং তাকে ক‚পের গভীরে নিক্ষেপ করতে একমত হল, এমতাবস্থায় আমি তাকে জানিয়ে দিলাম, ‘তুমি এদেরকে এদের এই কর্মের কথা অবশ্যই বলে দিবে যখন এরা তোমাকে চিনবে না।’


তাফসীরঃ

৯. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তখন ছিলেন শিশু। বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী তখন তাঁর বয়স ছিল সাত বছর। সুতরাং এ আয়াতে যে ওহীর কথা বলা হয়েছিল, তা নবুওয়াতের ওহী ছিল না। বরং এটা ছিল সেই জাতীয় ওহী, যা হযরত মূসা আলাইহিস সালামের মা’ কিংবা হযরত মারয়াম আলাইহিস সালামের বেলায় ব্যবহৃত হয়েছে। এর সারমর্ম এই যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যে-কোনও উপায়ে অভয়-বাণী শুনিয়ে দিয়েছিলেন। তাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এমন একটা দিন আসবে, যখন এরা তোমার সামনে মাথা নোয়াবে এবং এখন এরা যেসব দুষ্কর্ম করছে তার সবই তখন তুমি তাদের সামনে তুলে ধরবে আর তখন তারা তোমাকে চিনতেও পারবে না। সুতরাং তাদের এখনকার আচরণে তুমি ভয় পেও না। সামনে ৮৯ নং আয়াতে আসছে, মিসরের শাসক হওয়ার পর ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদের সামনে তাদের আচরণ তুলে ধরেছিলেন।


১৬


وَجَاءُوا أَبَاهُمْ عِشَاءً يَبْكُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

রাতে তারা কাঁদতে কাঁদতে তাদের পিতার কাছে আসল।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা রাতের বেলায় কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে এল।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা রাত্রির প্রথম প্রহরে কাঁদতে কাঁদতে এদের পিতার নিকট এলো।


১৭


قَالُوا يَا أَبَانَا إِنَّا ذَهَبْنَا نَسْتَبِقُ وَتَرَكْنَا يُوسُفَ عِندَ مَتَاعِنَا فَأَكَلَهُ الذِّئْبُ ۖ وَمَا أَنتَ بِمُؤْمِنٍ لَّنَا وَلَوْ كُنَّا صَادِقِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

বলতে লাগল, আব্বাজী! বিশ্বাস করুন, আমরা দৌড়-প্রতিযোগিতায় চলে গিয়েছিলাম আর ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। এই অবকাশে নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু আপনি তো আমাদের কথা বিশ্বাস করবেন না, তাতে আমরা যতই সত্যবাদী হই।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ পিতাঃ আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম এবং ইউসুফকে আসবাব-পত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। অতঃপর তাকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের নিকট রেখে গিয়েছিলাম, এরপর নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে; কিন্তু তুমি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবে না, যদিও আমরা সত্যবাদী।’


১৮


وَجَاءُوا عَلَىٰ قَمِيصِهِ بِدَمٍ كَذِبٍ ۚ قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আর তারা ইউসুফের জামায় মেকি রক্তও মাখিয়ে এনেছিল। ১০ তাদের পিতা বলল, (এটা সত্য নয়) বরং তোমাদের মন নিজের পক্ষ থেকে একটা গল্প বানিয়ে নিয়েছে। সুতরাং আমার জন্য ধৈর্যই শ্রেয়। আর তোমরা যেসব কথা তৈরি করছ সে ব্যাপারে আল্লাহরই সাহায্য প্রার্থনা করি।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং তারা তার জামায় কৃত্রিম রক্ত লাগিয়ে আনল। বললেনঃ এটা কখনই নয়; বরং তোমাদের মন তোমাদেরকে একটা কথা সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং এখন ছবর করাই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্য স্থল।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বলল, ‘না, তোমাদের মন তোমাদের জন্যে একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ই আমার সাহায্যস্থল।’


তাফসীরঃ

১০. কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, তারা জামায় রক্ত মাখিয়ে এনেছিল, কিন্তু জামাটি ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। কোথাও ছেঁড়া-ফাড়ার কোনও চিহ্ন ছিল না। তা দেখে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম মন্তব্য করেছিলেন, বাঘটিকে বড় প্রশিক্ষিত দেখছি! সে শিশুটিকে তো খেয়ে ফেলল, অথচ তার জামাটি একটুও ছিঁড়ল না, যেমনটা তেমনই রয়ে গেল। মোটকথা তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, বাঘে খাওয়ার কথাটি সম্পূর্ণ তাদের বানানো কেচ্ছা। তাই তিনি বলে দিলেন, একথা তোমরা নিজেদের পক্ষ থেকে তৈরি করে নিয়েছ।


১৯


وَجَاءَتْ سَيَّارَةٌ فَأَرْسَلُوا وَارِدَهُمْ فَأَدْلَىٰ دَلْوَهُ ۖ قَالَ يَا بُشْرَىٰ هَـٰذَا غُلَامٌ ۚ وَأَسَرُّوهُ بِضَاعَةً ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِمَا يَعْمَلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এবং (অন্য দিকে তারা ইউসুফকে যেখানে কুয়ায় ফেলেছিল, সেখানে) একটি যাত্রীদল আসল। তারা তাদের একজন লোককে পানি আনতে পাঠাল। সে (কুয়ায়) নিজ বালতি ফেলল। (তার ভেতর ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখে) সে বলে উঠল, তোমরা সুসংবাদ শোন, এ যে একটি বালক। ১১ অতঃপর যাত্রীদলের লোক তাকে একটি পণ্য মনে করে লুকিয়ে রাখল। আর তারা যা-কিছু করছিল সে বিষয়ে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত ছিলেন।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং একটি কাফেলা এল। অতঃপর তাদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে বালতি ফেলল। বললঃ কি আনন্দের কথা। এ তো একটি কিশোর তারা তাকে পন্যদ্রব্য গণ্য করে গোপন করে ফেলল। আল্লাহ খুব জানেন যা কিছু তারা করেছিল।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এক যাত্রীদল এলো, এরা এদের পানি সংগ্রাহককে প্রেরণ করল। সে তার পানির ডোল নামাইয়া দিল। সে বলে উঠল, ‘কী সুখবর! এ যে এক কিশোর!’ এরপর এরা তাকে পণ্যরূপে লুকিয়ে রাখলো। এরা যা করছিল সে বিষয়ে আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত ছিলেন।


তাফসীরঃ

১১. বর্ণিত আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কুয়ায় ফেলা হলে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে তিনি তার ভেতর সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন। কুয়ার ভেতর একটি পাথর ছিল। তিনি তার উপর উঠে বসে থাকলেন। যখন যাত্রীদলের পাঠানো লোকটি কুয়ার ভেতর বালতি ফেলল, তিনি সেই বালতিতে সওয়ার হয়ে গেলেন। লোকটি বালতি টেনে তুলতেই দেখতে পেল তার ভেতর একটি বালক। অমনি সে চিৎকার করে ওঠল এবং তার মুখ থেকে ওই কথা বের হয়ে গেল, যা এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।


২০


وَشَرَوْهُ بِثَمَنٍ بَخْسٍ دَرَاهِمَ مَعْدُودَةٍ وَكَانُوا فِيهِ مِنَ الزَّاهِدِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এবং (তারপর) তারা ইউসুফকে অতি অল্প দামে বিক্রি করে দিল- যা ছিল মাত্র কয়েক দিরহাম। বস্তুত ইউসুফের প্রতি তাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। ১২


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ওরা তাকে কম মূল্যে বিক্রি করে দিল গনাগুণতি কয়েক দেরহাম এবং তাঁর ব্যাপারে নিরাসক্ত ছিল।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এবং এরা তাকে বিক্রয় করল স্বল্প মূল্যে-মাত্র কয়েক দিরহামের বিনিময়ে, এরা ছিল তার ব্যাপারে নির্লোভ।


তাফসীরঃ

১২. কুরআন মাজীদের বর্ণনাভঙ্গি দ্বারা বাহ্যত এটাই বোঝা যায় যে, বিক্রেতা ছিল যাত্রীদলের লোক এবং হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে নিজেদের কাছে রাখার কোন আগ্রহ তাদের ছিল না; বরং তাকে বিক্রি করে যা-ই পাওয়া যায় সেটাকেই তারা লাভ মনে করেছিল, যেহেতু তা মুফতে অর্জিত হচ্ছিল। তাই যখন ক্রেতা পাওয়া গেল তখন নামমাত্র মূল্যে তাঁকে বিক্রি করে দিল। অবশ্য কোন কোন রিওয়ায়াতে ঘটনার যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তাতে প্রকাশ, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর ভাইয়েরা কুয়ায় ফেলে যাওয়ার পর বড় ভাই ইয়াহুদা রোজ তাঁর খবর নিতে আসত। কিছু খাবার-দাবারও দিয়ে যেত। তৃতীয় দিন তাঁকে কুয়ায় না পেয়ে চারদিকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত যাত্রীদলের কাছে তাঁকে পেয়ে গেল। এ সময় অন্যান্য ভাইয়েরাও সেখানে উপস্থিত হল। তারা যাত্রীদলকে বলল, এ বালক আমাদের গোলাম। সে পালিয়ে গিয়েছিল। তোমাদের আগ্রহ থাকলে আমরা একে তোমাদের কাছে বিক্রি করতে পারি। ভাইদের আসল উদ্দেশ্য তো ছিল কোনও উপায়ে তাকে পিতার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া। তাকে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন তাদের লক্ষ্য ছিল না। তাই তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যাত্রীদলের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিল। বাইবেলেও বলা হয়েছে তাঁর বিক্রেতা ছিল ভাইয়েরাই। তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যাত্রীদলের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল।


২১


وَقَالَ الَّذِي اشْتَرَاهُ مِن مِّصْرَ لِامْرَأَتِهِ أَكْرِمِي مَثْوَاهُ عَسَىٰ أَن يَنفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا ۚ وَكَذَٰلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ وَلِنُعَلِّمَهُ مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ وَاللَّهُ غَالِبٌ عَلَىٰ أَمْرِهِ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, একে সম্মানজনকভাবে রাখবে। আমার মনে হয় সে আমাদের উপকারে আসবে অথবা আমরা একে পুত্র বানিয়ে নেব। ১৩ এভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে প্রতিষ্ঠা দান করলাম, তাকে কথাবার্তার সঠিক মর্ম শেখানোর জন্য। ১৪ নিজ কাজে আল্লাহ পূর্ণ ক্ষমতাবান, কিন্তু বহু লোক জানে না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

মিসরে যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করল, সে তার স্ত্রীকে বললঃ একে সম্মানে রাখ। সম্ভবতঃ সে আমাদের কাছে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করে নেব। এমনিভাবে আমি ইউসুফকে এদেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম এবং এ জন্যে যে তাকে বাক্যাদির পূর্ণ মর্ম অনুধাবনের পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষা দেই। আল্লাহ নিজ কাজে প্রবল থাকেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

মিসরের যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করেছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘এর থাকবার সম্মানজনক ব্যবস্থা কর, সম্ভবত সে আমাদের উপকারে আসবে বা আমরা একে পুত্ররূপেও গ্রহণ করতে পারি।’ এবং এভাবে আমি ইউসুফকে সেই দেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিবার জন্যে। আল্লাহ্ তাঁর কার্য সম্পাদনে অপ্রতিহত; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়।


তাফসীরঃ

১৩. وَ لِنُعَلِّمَهٗ-এর ’و‘ অব্যয়টি অতিরিক্ত। তরজমা সে হিসেবেই করা হয়েছে। কারও মতে এর দ্বারা لنعلمه (তাকে শেখানোর জন্য) বাক্যটিকে উহ্য বাক্য لِيَحْكُمْ بالعدل (যাতে সে ন্যায়পরায়ণতার সাথে শাসন করে)-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ ইউসুফকে মুক্তিদান ও তাকে মিসরে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবে, মানুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে নেতৃত্ব দেবে এবং আল্লাহর কিতাব ও বিধি-বিধান শিখে তা জারি করবে (বা রাজকীয় লোকদের সাথে ওঠাবসা করে রাষ্ট্রীয় রীতি-নীতি, কথাবার্তা ও ধরন-ধারণ শিখবে এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যাসহ যে কোন কথার মর্ম অনুধাবনের যোগ্যতা অর্জন করবে)। [তাফসীরে মাজহারী ও উছমানী অবলম্বনে]। -অনুবাদক


১৪. কুরআন মাজীদের একটা বিশেষ রীতি হল কোন ঘটনা বর্ণনাকালে তার অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটির পিছনে না পড়া; বরং গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ বর্ণনা করেই ক্ষান্ত থাকা। আলোচ্য ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে ফিলিস্তিনের মরুভূমি থেকে যারা কিনেছিল, তা সে ক্রেতা যাত্রীদলের লোক হোক বা তাদের কাছ থেকে যারা কিনেছিল তারা হোক, শেষ পর্যন্ত তারা তাকে মিসর নিয়ে গেল এবং সেখানে তাঁকে উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে দিল। মিসরে তাঁকে যে ব্যক্তি কিনেছিল, সে ছিল দেশের অর্থমন্ত্রী। সেকালে তার উপাধি ছিল ‘আযীয’। আযীয তার স্ত্রীকে গুরুত্ব দিয়ে বলল, যেন ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখে। বর্ণিত আছে, তার স্ত্রীর নাম ছিল ‘যুলায়খা’।


২২


وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল, তখন আমি তাকে হিকমত ও ইলম দান করলাম। যারা সৎকর্ম করে, এভাবেই আমি তাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌছে গেল, তখন তাকে প্রজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি দান করলাম। এমননিভাবে আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে প্রতিদান দেই।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল তখন আমি তাকে হিক্মত ও জ্ঞান দান করলাম এবং এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে পুরস্কৃত করি।


২৩


وَرَاوَدَتْهُ الَّتِي هُوَ فِي بَيْتِهَا عَن نَّفْسِهِ وَغَلَّقَتِ الْأَبْوَابَ وَقَالَتْ هَيْتَ لَكَ ۚ قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ رَبِّي أَحْسَنَ مَثْوَايَ ۖ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

যে নারীর ঘরে সে থাকত, সে তাকে ফুসলানোর চেষ্টা করল ১৫ এবং সবগুলো দরজা বন্ধ করে দিল ও বলল, এসে পড়। ইউসুফ বলল, আল্লাহ পানাহ! তিনি আমার মনিব। তিনি আমাকে ভালোভাবে রেখেছেন। ১৬ সত্য কথা হচ্ছে, যারা জুলুম করে তারা কৃতকার্য হয় না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আর সে যে মহিলার ঘরে ছিল, ঐ মহিলা তাকে ফুসলাতে লাগল এবং দরজাসমূহ বন্ধ করে দিল। সে মহিলা বললঃ শুন! তোমাকে বলছি, এদিকে আস, সে বললঃ আল্লাহ রক্ষা করুন; তোমার স্বামী আমার মালিক। তিনি আমাকে সযত্নে থাকতে দিয়েছেন। নিশ্চয় সীমা লংঘনকারীগণ সফল হয় না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে যে স্ত্রীলোকের গৃহে ছিল সে তা হতে অসৎকর্ম কামনা করল এবং দরজাগুলি বন্ধ করে দিল ও বলল, ‘আস।’ সে বলল, ‘আমি আল্লাহ্ র শরণ নিচ্ছি, তিনি আমার প্রভু; তিনি আমার থাকবার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারীরা সফলকাম হয় না।’


তাফসীরঃ

১৫. এস্থলে ‘মনিব’ বলে আল্লাহ তাআলাকেও বোঝানো যেতে পারে এবং মিসরের সেই আযীযকেও, যে ইউসুফ আলাইহিস সালামকে নিজ গৃহে সম্মানজনকভাবে রেখেছিল। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যের অর্থ হচ্ছে, তুমি আমার মনিবের স্ত্রী। তোমার কথা শুনে আমি তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা কিভাবে করতে পারি?


১৬. এ নারী ছিল আযীযের স্ত্রী যুলায়খা, যার কথা পূর্বের টীকায় বলা হয়েছে। ইউসুফ আলাইহিস সালামের অনন্যসাধারণ পৌরুষদীপ্ত সৌন্দর্যের কারণে সে তাঁর প্রতি বেজায় আসক্ত হয়ে পড়েছিল। আসক্তির আতিশয্যে এক পর্যায়ে সে তাকে পাপকর্মেরও আহ্বান জানিয়ে বসল। কুরআন মাজীদে তার নামোল্লেখ না করে বলা হয়েছে, ‘যার ঘরে সে থাকত’। এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইউসুফ আলাইহিস সালামের পক্ষে যুলায়খার ডাকে সাড়া না দেওয়া এ কারণেও কঠিন ছিল যে, তিনি তার ঘরেই অবস্থান করছিলেন, যদ্দরুণ তাঁর উপর যুলায়খার এক রকমের কর্তৃত্বও ছিল।


২৪


وَلَقَدْ هَمَّتْ بِهِ ۖ وَهَمَّ بِهَا لَوْلَا أَن رَّأَىٰ بُرْهَانَ رَبِّهِ ۚ كَذَٰلِكَ لِنَصْرِفَ عَنْهُ السُّوءَ وَالْفَحْشَاءَ ۚ إِنَّهُ مِنْ عِبَادِنَا الْمُخْلَصِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

স্ত্রীলোকটি তো স্পষ্টভাবেই ইউসুফের সাথে (অসৎ কর্ম) কামনা করেছিল আর ইউসুফের মনেও স্ত্রীলোকটির প্রতি ইচ্ছা জাগ্রত হয়েই যাচ্ছিল যদি না সে নিজ প্রতিপালকের প্রমাণ দেখতে পেত। ১৭ আমি তার থেকে অসৎ কর্ম ও অশ্লীলতাকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যই এরূপ করেছিলাম। নিশ্চয়ই সে আমার মনোনীত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

নিশ্চয় মহিলা তার বিষয়ে চিন্তা করেছিল এবং সেও মহিলার বিষয়ে চিন্তা করত। যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার মহিমা অবলোকন করত। এমনিবাবে হয়েছে, যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ বিষয় ও নিলজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয় সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সেই রমণী তো তার প্রতি আসক্ত হয়েছিল এবং সেও এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ত যদি না সে তার প্রতিপালকের নিদর্শন প্রত্যক্ষ করত। আমি তাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা হতে বিরত রাখবার জন্যে এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।


তাফসীরঃ

১৭. এ আয়াতের তাফসীর দু’ভাবে করা যায়। (এক) হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজ প্রতিপালকের পক্ষ হতে একটি প্রমাণ না দেখলে তাঁর মনেও যুলায়খার প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হয়ে যেত, কিন্তু আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যেহেতু তিনি একটি প্রমাণ দেখতে পেয়েছিলেন, (যার ব্যাখ্যা সামনে আসছে) তাই তাঁর অন্তরে সে নারীর প্রতি কোনও কু-ভাব দেখা দেয়নি। (দুই) আয়াতের অর্থ এমনও হতে পারে যে, শুরুতে তাঁর অন্তরেও কিছুটা ঝোঁক সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল, যা একটা সাধারণ মানবীয় চাহিদা ছিল। হযরত হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী (রহ.) এর একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, রোযাদার ব্যক্তি পিপাসার্ত অবস্থায় যদি ঠাণ্ডা পানি দেখে, তবে তার অন্তরে স্বাভাবিকভাবেই সে পানির প্রতি একটা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, কিন্তু তাই বলে সে রোযা ভাঙ্গার মোটেই ইচ্ছা করে না। ঠিক এ রকমই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের অন্তরে অনিচ্ছাজনিত একটা ঝোঁক দেখা দিয়ে থাকবে। তিনি স্বীয় প্রতিপালকের নিদর্শন দেখতে না পেলে সেই ঝোঁক হয়ত আরও সামনে এগিয়ে যেত, কিন্তু তিনি যেহেতু প্রতিপালকের নিদর্শন দেখতে পেয়েছিলেন, তাই মুহূর্তের ভেতর সেই অনিচ্ছাকৃত ঝোঁকও লোপ পেয়ে যায়। অধিকাংশ তাফসীরবিদ এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাকেই গ্রহণ করেছেন। কেননা আরবী ব্যাকরণের দিকে লক্ষ্য করলে এ ব্যাখ্যাই বেশি নিয়মসিদ্ধ হয়। দ্বিতীয়ত এর দ্বারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের চরিত্র যে কতটা উচ্চ পর্যায়ের ছিল তা ভালো অনুমান করা যায়। তার অন্তরে এই অনিচ্ছাকৃত ঝোঁকও যদি সৃষ্টি না হত, তবে গুনাহ থেকে আত্মরক্ষা খুব বেশি কঠিন হত না। এটা বেশি কঠিন হয় অন্তরে ঝোঁক দেখা দেওয়ার পরই। আর তখন বলিষ্ঠ নীতিবোধ ও অসাধারণ মনোবল ছাড়া নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। কুরআন ও হাদীস দ্বারা জানা যায়, মনের চাহিদা সত্ত্বেও যদি আল্লাহ তাআলার ভয়ে নিজেকে সংযত রেখে গুনাহ থেকে বিরত থাকা যায়, তবে তা অধিকতর সওয়াব ও পুরস্কারের কারণ হয়। প্রশ্ন থেকে যায় যে, আয়াতে আল্লাহ তাআলা যে বিষয়টাকে “স্বীয় প্রতিপালকের দলীল” সাব্যস্ত করেছেন, সে দলীল আসলে কী ছিল? এ প্রশ্নের পরিষ্কার ও নিখুঁত উত্তর হল এই যে, এর দ্বারা সেই কাজটির গুনাহ হওয়ার দলীল বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সেটি যে একটা পাপকর্ম এই বিষয়টি তিনি চিন্তা করেছিলেন এবং এ কারণে তিনি তা থেকে বিরত থেকেছিলেন। কোন-কোন বর্ণনায় এর ব্যাখ্যা পাওয়া যায় যে, তখন তাঁকে তাঁর মহান পিতা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের প্রতিকৃতি দেখানো হয়েছিল আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।


২৫


وَاسْتَبَقَا الْبَابَ وَقَدَّتْ قَمِيصَهُ مِن دُبُرٍ وَأَلْفَيَا سَيِّدَهَا لَدَى الْبَابِ ۚ قَالَتْ مَا جَزَاءُ مَنْ أَرَادَ بِأَهْلِكَ سُوءًا إِلَّا أَن يُسْجَنَ أَوْ عَذَابٌ أَلِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এবং তারা একজনের পেছনে আরেকজন দৌড়ে দরজার দিকে গেল এবং (এই টানা-হেঁচড়ার ভেতর) স্ত্রীলোকটি তার জামা পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেলল। ১৮ এ অবস্থায় তারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজায় দাঁড়ানো পেল। স্ত্রীলোকটি তৎক্ষণাৎ (কেচ্ছা ফাঁদার লক্ষ্যে স্বামীকে) বলল, যে ব্যক্তি তোমার স্ত্রীর সাথে মন্দ কাজের ইচ্ছা করে, তার শাস্তি কারারুদ্ধ করা বা অন্য কোন কঠিন শাস্তি দেওয়া ছাড়া আর কী হতে পারে?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা উভয়ে ছুটে দরজার দিকে গেল এবং মহিলা ইউসুফের জামা পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেলল। উভয়ে মহিলার স্বামীকে দরজার কাছে পেল। মহিলা বললঃ যে ব্যক্তি তোমার পরিজনের সাথে কুকর্মের ইচ্ছা করে, তাকে কারাগারে পাঠানো অথবা অন্য কোন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেয়া ছাড়া তার আর কি শাস্তি হতে পারে?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা উভয়ে দৌড়িয়ে দরজার দিকে গেল এবং স্ত্রীলোকটি পিছন হতে তার জামা ছিঁড়ে ফেলল, তারা স্ত্রীলোকটির স্বামীকে দরজার নিকট পেল। স্ত্রীলোকটি বলল, ‘যে তোমার পরিবারের সঙ্গে কুকর্ম কামনা করে তার জন্যে কারাগারে প্রেরণ বা অন্য কোন মর্মন্তুদ শাস্তি ব্যতীত আর কী দণ্ড হতে পারে ?’


তাফসীরঃ

১৮. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্ত্রীলোকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে পালাচ্ছিলেন আর স্ত্রীলোকটি তাঁকে পেছন দিক থেকে টেনে ধরছিল। এই টানা-হেঁচড়ার কারণে পেছন দিক থেকে জামা ছিঁড়ে যায়।


২৬


قَالَ هِيَ رَاوَدَتْنِي عَن نَّفْسِي ۚ وَشَهِدَ شَاهِدٌ مِّنْ أَهْلِهَا إِن كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِن قُبُلٍ فَصَدَقَتْ وَهُوَ مِنَ الْكَاذِبِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ বলল, সে নিজেই তো আমাকে ফুসলাচ্ছিল। স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষ্য দিল, ইউসুফের জামার সম্মুখ দিক থেকে ছিঁড়ে থাকলে স্ত্রীলোকটিই সত্য বলেছে আর সে মিথ্যাবাদী।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইউসুফ (আঃ) বললেন, সেই আমাকে আত্মসংবরণ না করতে ফুসলিয়েছে। মহিলার পরিবারে জনৈক সাক্ষী দিল যে, যদি তার জামা সামনের দিক থেকে ছিন্ন থাকে, তবে মহিলা সত্যবাদিনী এবং সে মিথ্যাবাদি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ বলল, ‘সে-ই আমা হতে অসৎকর্ম কামনা করেছিল।’ স্ত্রীলোকটির পরিবারের একজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিল, ‘যদি এর জামার সম্মুখ দিক ছিন্ন করা হয়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি সত্য কথা বলেছে এবং পুরুষটি মিথ্যাবাদী,


২৭


وَإِن كَانَ قَمِيصُهُ قُدَّ مِن دُبُرٍ فَكَذَبَتْ وَهُوَ مِنَ الصَّادِقِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আর যদি তার জামা পেছন দিক থেকে ছিঁড়ে থাকে, তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলেছে এবং সে সত্যবাদী। ১৯


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং যদি তার জামা পেছনের দিক থেকে ছিন্ন থাকে, তবে মহিলা মিথ্যাবাদিনী এবং সে সত্যবাদী।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘কিন্তু এর জামা যদি পিছন দিক হতে ছিন্ন করা হয়ে থাকে তবে স্ত্রীলোকটি মিথ্যা বলেছে এবং পুরুষটি সত্যবাদী।’


তাফসীরঃ

১৯. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে নির্দোষ, আল্লাহ তাআলা এটা আযীযের কাছে পরিষ্কার করে দিতে চাইলেন। আর এজন্য তিনি এই ব্যবস্থা করলেন যে, যুলায়খারই পরিবারের এক ব্যক্তিকে মীমাংসাকারী বানিয়ে দিলেন। সে সত্য-মিথ্যার মধ্যে প্রভেদ করার জন্য এমন এক আলামত বলে দিল যার যৌক্তিকতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তার বক্তব্য ছিল, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামা সম্মুখ দিক থেকে ছিঁড়ে থাকলে সেটা প্রমাণ করবে যে, তিনি স্ত্রীলোকটির দিকে এগোতে চাচ্ছিলেন আর স্ত্রীলোকটি হাত বাড়িয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। এই জোরাজুরির ভেতর তাঁর জামা ছিঁড়ে যায়। কিন্তু তাঁরা জামা যদি পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে থাকে, তবে তার অর্থ হবে তিনি পালানোর চেষ্টা করছিলেন আর যুলায়খা পশ্চাদ্বাবন করে তাকে আটকাতে চাচ্ছিল। এক পর্যায়ে যুলায়খা তাঁর জামা ধরে তাঁকে নিজের দিকে টেনে নিতে চাইলে তাতে জামা ছিঁড়ে যায়। এক তো তার একথা অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয়ত নির্ভরযোগ্য কিছু হাদীস দ্বারা জানা যায় এ সাক্ষ্য দিয়েছিল যুলায়খার পরিবারের একটি ছোট্ট শিশু, তখনও পর্যন্ত যার কথা বলার মত বয়স হয়নি। আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের পবিত্রতা প্রমাণ করার জন্য তখন তাকে কথা বলার শক্তি দান করেন, যেমন কথা বলার শক্তি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে দান করেছিলেন। মোটকথা এই অনস্বীকার্য প্রমাণ হাতে পাওয়ার পর আযীযের আর কোনও সন্দেহ থাকল না যে, সবটা দোষ তার স্ত্রীরই এবং ইউসুফ আলাইহিস সালাম এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্দোষ।


২৮


فَلَمَّا رَأَىٰ قَمِيصَهُ قُدَّ مِن دُبُرٍ قَالَ إِنَّهُ مِن كَيْدِكُنَّ ۖ إِنَّ كَيْدَكُنَّ عَظِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

অতঃপর স্বামী যখন দেখল তার জামা পেছন থেকে ছিঁড়েছে, তখন সে বলল, এটা তোমাদের নারীদের ছলনা, বস্তুত তোমাদের ছলনা বড়ই কঠিন।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর গৃহস্বামী যখন দেখল যে, তার জামা পেছন দিক থেকে ছিন্ন, তখন সে বলল, নিশ্চয় এটা তোমাদের ছলনা। নিঃসন্দেহে তোমাদের ছলনা খুবই মারাত্নক।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

গৃহস্বামী যখন দেখল যে, তার জামা পিছন দিক হতে ছিন্ন করা হয়েছে তখন সে বলল, ‘নিশ্চয়ই এটা তোমাদের নারীদের ছলনা, তোমাদের ছলনা তো ভীষণ।’


২৯


يُوسُفُ أَعْرِضْ عَنْ هَـٰذَا ۚ وَاسْتَغْفِرِي لِذَنبِكِ ۖ إِنَّكِ كُنتِ مِنَ الْخَاطِئِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ! তুমি এ বিষয়টাকে একদম পাত্তা দিও না। আর হে নারী! তুমি নিজ অপরাধের জন্য ক্ষমা চাও। নিশ্চয় তুমিই অপরাধী ছিলে। ২০


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইউসুফ এ প্রসঙগ ছাড়! আর হে নারী, এ পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর নিঃসন্দেহে তুমি-ই পাপাচারিনী।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘হে ইউসুফ! তুমি এটা উপেক্ষা কর এবং হে নারী! তুমি তোমার অপরাধের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর; তুমিই তো অপরাধী।’


তাফসীরঃ

২০. আযীয বিলক্ষণ বুঝে ফেলেছিলেন, অপরাধ করেছিল তার স্ত্রীই। কিন্তু সম্ভবত দুর্নামের ভয়ে বিষয়টা গোপন করেছিলেন।


৩০


۞ وَقَالَ نِسْوَةٌ فِي الْمَدِينَةِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ تُرَاوِدُ فَتَاهَا عَن نَّفْسِهِ ۖ قَدْ شَغَفَهَا حُبًّا ۖ إِنَّا لَنَرَاهَا فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

নগরে কতিপয় নারী বলাবলি করল, ‘আযীযের স্ত্রী তার তরুণ গোলামকে ফুসলাচ্ছে। তরুণটির ভালোবাসা তাকে বিভোর করে ফেলেছে। আমাদের ধারণা সে নিশ্চয়ই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে লিপ্ত রয়েছে।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

নগরে মহিলারা বলাবলি করতে লাগল যে, আযীযের স্ত্রী স্বীয় গোলামকে কুমতলব চরিতার্থ করার জন্য ফুসলায়। সে তার প্রেমে উম্মত্ত হয়ে গেছে। আমরা তো তাকে প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

নগরে কতিপয় নারী বলল, ‘আযীযের স্ত্রী তার যুবক দাস হতে অসৎ কর্ম কামনা করছে, প্রেম তাকে উন্মত্ত করেছে, আমরা তো তাকে দেখতেছি স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।’


৩১


فَلَمَّا سَمِعَتْ بِمَكْرِهِنَّ أَرْسَلَتْ إِلَيْهِنَّ وَأَعْتَدَتْ لَهُنَّ مُتَّكَأً وَآتَتْ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِّنْهُنَّ سِكِّينًا وَقَالَتِ اخْرُجْ عَلَيْهِنَّ ۖ فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا هَـٰذَا بَشَرًا إِنْ هَـٰذَا إِلَّا مَلَكٌ كَرِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সুতরাং যখন সে (অর্থাৎ, আযীযের স্ত্রী) সেই নারীদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, ২১ তখন সে বার্তা পাঠিয়ে তাদেরকে (নিজ গৃহে) ডেকে আনল এবং তাদের জন্য তাকিয়া-বিশিষ্ট একটি জলসার ব্যবস্থা করল এবং তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে ছুরি দিল ২২ এবং (ইউসুফকে) বলল, একটু বের হয়ে তাদের সামনে আস। অতঃপর সেই নারীরা যেই না ইউসুফকে দেখল, তাকে বিস্ময়কর (রকমের রূপবান) পেল এবং (তারা তার অপরূপ রূপে হতভম্ব হয়ে) নিজ-নিজ হাত কেটে ফেলল। আর তারা বলে উঠল, আল্লাহ পানাহ! এ ব্যক্তি কোন মানুষ নয়। এ সম্মানিত ফেরেশতা ছাড়া কিছুই হতে পারে না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যখন সে তাদের চক্রান্ত শুনল, তখন তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্যে একটি ভোজ সভার আয়োজন করল। সে তাদের প্রত্যেককে একটি ছুরি দিয়ে বললঃ ইউসুফ এদের সামনে চলে এস। যখন তারা তাকে দেখল, হতভম্ব হয়ে গেল এবং আপন হাত কেটে ফেলল। তারা বললঃ কখনই নয় এ ব্যক্তি মানব নয়। এ তো কোন মহান ফেরেশতা।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

স্ত্রীলোকটি যখন এদের ষড়যন্ত্রের কথা শুনল, তখন সে এদেরকে ডেকে পাঠাল, এদের জন্যে আসন প্রস্তুত করল, এদের প্রত্যেককে একটি করে ছুরি দিল এবং ইউসুফকে বলল, ‘এদের সামনে বের হও।’ এরপর এরা যখন তাকে দেখল তখন এরা তার গরিমায় অভিভূত হল এবং নিজেদের হাত কেটে ফেলল। এরা বলল, ‘অদ্ভুত আল্লাহ্ র মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়, এ তো এক মহিমান্বিত ফেরেশতা!’


তাফসীরঃ

২১. তাদের আতিথেয়তার জন্য দস্তরখানে ফল রাখা হয়েছিল এবং তা কাটার জন্য তাদেরকে ছুরি দেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত যুলায়খা অনুমান করতে পেরেছিল সে নারীরা যখন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখবে, তখন সম্বিৎ হারিয়ে নিজ-নিজ হাতেই ছুরি চালিয়ে বসবে। সুতরাং সামনে বলা হয়েছে, তারা যখন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখল, তখন তার রূপ ও সৌন্দর্যে এতটা মোহিত হয়ে গেল যে, সত্যিই তারা তাদের মনের অজান্তে হাতে ছুরি চালিয়ে দিল।


২২. নারীদের কথাবার্তাকে (مكر) ‘ষড়যন্ত্র’ বলা হয়েছে সম্ভবত এ কারণে যে, তারা এসব কথা কোন সহমর্মিতা ও কল্যাণ কামনার জন্য বলেনি; বরং কেবল যুলায়খার দুর্নাম করাই উদ্দেশ্য ছিল। অসম্ভব নয় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের রূপ ও সৌন্দর্যের সুখ্যাতি শুনে তাদের অন্তরে তাঁকে একবার দেখার সাধ জন্মেছিল। তারা মনে করেছিল দুর্নামের কথা শুনে যুলায়খা তাদেরকে সেই সুযোগ করে দেবে।

আরো পড়ুন :-

স্মরণ শক্তি বৃদ্ধির দোয়া,মেধা বৃদ্ধির দোয়া,স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর দোয়া!নামাজের পর ২১ বাড় পড়ুন

দোয়াটি পড়লে সাথে সাথে রাগ কমে যায়, রাগ কমানোর দোয়া,শিশুদের রাগ কমানোর আমল

(ads2)

(getButton) #text=(আল কোরআন বাংলা অনুবাদ ) #file=(Al Quran Bangla) #icon=(download) #size=(25) #color=(#d10404) #info=(PDF Download)


৩২


قَالَتْ فَذَٰلِكُنَّ الَّذِي لُمْتُنَّنِي فِيهِ ۖ وَلَقَدْ رَاوَدتُّهُ عَن نَّفْسِهِ فَاسْتَعْصَمَ ۖ وَلَئِن لَّمْ يَفْعَلْ مَا آمُرُهُ لَيُسْجَنَنَّ وَلَيَكُونًا مِّنَ الصَّاغِرِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সে (অর্থাৎ) আযীযের স্ত্রী বলল, এবার দেখ, এই হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার ব্যাপারে তোমরা আমার নিন্দা করেছ। একথা সত্যই যে, আমি আমার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য তাকে ফুসলানি দিয়েছিলাম, কিন্তু সে নিজেকে রক্ষা করেছে। সে যদি আমার কথা না শোনে, তবে তাকে অবশ্যই কারারুদ্ধ করা হবে এবং সে নির্ঘাত লাঞ্ছিত হবে।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

মহিলা বললঃ এ ঐ ব্যক্তি, যার জন্যে তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করছিলে। আমি ওরই মন জয় করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে। আর আমি যা আদেশ দেই, সে যদি তা না করে, তবে অবশ্যই সে কারাগারে প্রেরিত হবে এবং লাঞ্চিত হবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘এ-ই সে যার সম্বন্ধে তোমরা আমার নিন্দা করেছ। আমি তো তা হতে অসৎ কর্ম কামনা করেছি। কিন্তু সে নিজেকে পবিত্র রেখেছে; আমি তাকে যা আদেশ করেছি সে যদি তা না করে, তবে সে কারারুদ্ধ হবেই এবং হীনদের অন্তর্ভুক্ত হবে।


৩৩


قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ۖ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُن مِّنَ الْجَاهِلِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ দু‘আ করল, হে প্রতিপালক! এই নারীগণ আমাকে যে কাজের দিকে ডাকছে, তা অপেক্ষা কারাগারই আমার বেশি পছন্দ। ২৩ তুমি যদি আমাকে তাদের ছলনা থেকে রক্ষা না কর, তবে আমার অন্তর তাদের দিকে আকৃষ্ট হবে এবং যারা অজ্ঞতাসুলভ কাজ করে আমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইউসুফ বললঃ হে পালনকর্তা তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহবান করে, তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার উপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাব।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই নারীগণ আমাকে যার প্রতি আহ্বান করছে তা অপেক্ষা কারাগার আমার নিকট অধিক প্রিয়। আপনি যদি এদের ছলনা হতে আমাকে রক্ষা না করেন তবে আমি এদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’


তাফসীরঃ

২৩. কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, যেই নারীরা ইতঃপূর্বে যুলায়খার নিন্দা করছিল, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখার পর তারাই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে উপদেশ দিতে শুরু করল যে, তোমার উচিত তোমার মালকিনের কথা মানা। কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, সেই নারীদের মধ্যেও কেউ কেউ উপদেশ দানের ছলে নিভৃতে ডেকে নিয়ে পাপকর্মের আহ্বান জানাতে শুরু করল। এ কারণেই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিজ দু‘আয় কেবল যুলায়খার নয়, বরং সকলের কথাই উল্লেখ করেছিলেন।


৩৪


فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সুতরাং ইউসুফের প্রতিপালক তাঁর দু‘আ কবুল করলেন এবং সেই নারীদের ছলনা থেকে তাকে রক্ষা করলেন। নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর তার পালনকর্তা তার দোয়া কবুল করে নিলেন। অতঃপর তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর তার প্রতিপালক তার আহ্বানে সাড়া দিলেন এবং তাকে এদের ছলনা হতে রক্ষা করলেন। তিনি তো সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।


৩৫


ثُمَّ بَدَا لَهُم مِّن بَعْدِ مَا رَأَوُا الْآيَاتِ لَيَسْجُنُنَّهُ حَتَّىٰ حِينٍ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

অতঃপর (ইউসুফের পবিত্রতার) বহু নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও তারা এটাই সমীচীন মনে করল যে, তাকে কিছু কালের জন্য কারাগারে পাঠাবেই। ২৪


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর এসব নিদর্শন দেখার পর তারা তাকে কিছুদিন কারাগারে রাখা সমীচীন মনে করল।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

নিদর্শনাবলী দেখার পর এদের মনে হল যে, তাকে কিছু কালের জন্যে কারারুদ্ধ করতেই হবে।


তাফসীরঃ

২৪. অর্থাৎ, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে নির্দোষ এবং তার চরিত্র সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ এর বহু দলীল-প্রমাণ তাদের সামনে উপস্থিত ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আযীয যেহেতু তার স্ত্রীকে দুর্নাম থেকে বাঁচাতে ও ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চাচ্ছিল, তাই সে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কিছু কালের জন্য কারারুদ্ধ করে রাখাই সমীচীন মনে করল।


৩৬


وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَتَيَانِ ۖ قَالَ أَحَدُهُمَا إِنِّي أَرَانِي أَعْصِرُ خَمْرًا ۖ وَقَالَ الْآخَرُ إِنِّي أَرَانِي أَحْمِلُ فَوْقَ رَأْسِي خُبْزًا تَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْهُ ۖ نَبِّئْنَا بِتَأْوِيلِهِ ۖ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফের সাথে আরও দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। ২৫ তাদের একজন (একদিন ইউসুফকে) বলল, আমি (স্বপ্নে) নিজেকে দেখলাম, মদ নিংড়াচ্ছি। আর দ্বিতীয়জন বলল, আমি (স্বপ্নে) দেখলাম যে, নিজ মাথায় রুটি বহন করছি এবং পাখি তা থেকে খাচ্ছে। তুমি আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলে দাও। আমরা তোমাকে একজন ভালো মানুষ দেখছি।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তাঁর সাথে কারাগারে দুজন যুবক প্রবেশ করল। তাদের একজন বললঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি মদ নিঙড়াচ্ছি। অপরজন বললঃ আমি দেখলাম যে, নিজ মাথায় রুটি বহন করছি। তা থেকে পাখী ঠুকরিয়ে খাচ্ছে। আমাদের কে এর ব্যাখ্যা বলুন। আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখতে পাচ্ছি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তার সঙ্গে দু’জন যুবক কারাগারে প্রবেশ করল। এদের একজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আংগুর নিংড়িয়ে রস বের করছি’, এবং অপরজন বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি আমার মস্তকে রুটি বহন করছি এবং পাখি তা হতে খাচ্ছে। আমাদেরকে তুমি এটার তাৎপর্য জানিয়ে দাও, আমরা তো তোমাকে সৎকর্মপরায়ণ দেখছি।’


তাফসীরঃ

২৫. রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায়, তাদের একজন বাদশাহকে মদ পান করাত আর দ্বিতীয়জন ছিল তার বাবুর্চি। তাদের প্রতি বাদশাহকে বিষ পান করানোর অভিযোগ ছিল এবং সেই অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছিল। সেটাই তাদের কারাবাসের কারণ। কারাগারে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সঙ্গে সাক্ষাত হলে তারা তাঁর কাছে নিজ-নিজ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইল।


৩৭


قَالَ لَا يَأْتِيكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقَانِهِ إِلَّا نَبَّأْتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَن يَأْتِيَكُمَا ۚ ذَٰلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي ۚ إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَّا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُم بِالْآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ বলল, (কারাগারে) তোমাদেরকে যে খাবার দেওয়া হয়, তা আসার আগেই আমি তোমাদেরকে এর রহস্য বলে দেব। ২৬ এটা সেই জ্ঞানের অংশ, যা আমার প্রতিপালক আমাকে দান করেছেন। (কিন্তু তার আগে তোমরা আমার একটা কথা শোন)। ব্যাপার এই যে, যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না ও যারা আখেরাতে অবিশ্বাসী, আমি তাদের দীন পরিত্যাগ করেছি। ২৭


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি বললেনঃ তোমাদেরকে প্রত্যহ যে খাদ্য দেয়া হয়, তা তোমাদের কাছে আসার আগেই আমি তার ব্যাখ্যা বলে দেব। এ জ্ঞান আমার পালনকর্তা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আমি ঐসব লোকের ধর্ম পরিত্যাগ করেছি যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না এবং পরকালে অবিশ্বাসী।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ বলল, ‘তোমাদেরকে যে খাদ্য দেওয়া হয় তা আসার পূর্বেই আমি তোমাদেরকে স্বপ্নের তাৎপর্য জানিয়ে দিব। আমি যা তোমাদেরকে বলিব তা, আমার প্রতিপালক আমাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা হতে বলব। যে সম্প্রদায় আল্লাহে বিশ্বাস করে না ও আখিরাতে অবিশ্বাসী আমি তাদের মতবাদ বর্জন করেছি।


তাফসীরঃ

২৬. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন দেখলেন সেই বন্দীদ্বয় স্বপ্নের তাবীরের ব্যাপারে তাঁর প্রতি আস্থাশীল এবং তারা তাঁকে একজন ভালো লোক বলেও বিশ্বাস করে, তখন স্বপ্নের তাবীর বলার আগে তাদেরকে সত্য-দীনের প্রতি দাওয়াত দেওয়া সমীচীন মনে করলেন। বিশেষত এ কারণেও যে, তাদের একজনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা ছিল তাকে শূলে চড়ানো হবে। আর এভাবে তার ইহজীবন সাঙ্গ হয়ে যাবে। তাই তিনি চাইলেন, যাতে সে অন্তত মৃত্যুর আগে ঈমান আনয়ন করে, তাহলে তার আখেরাতের জীবনে মুক্তি লাভ হবে। এটাই নবীসুলভ কর্মপন্থা। তারা যখন উপযুক্ত কোন সময় পেয়ে যান, তখন আর দাওয়াত পেশ করতে বিলম্ব করেন না।


২৭. কোন কোন মুফাসসির এর ব্যাখ্যা করেছেন যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাদেরকে অল্পক্ষণের মধ্যেই স্বপ্নের তাবীর বলে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, জেলে তোমরা যে খাবার পেয়ে থাক, তা তোমাদের কাছে আসার আগে-আগেই আমি তোমাদেরকে তা জানিয়ে দেব। আবার কতক মুফাসসিরের ব্যাখ্যা হল, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলতে চাচ্ছেন, আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যে, তা দ্বারা আমি তোমাদের জেল থেকে প্রাপ্তব্য খাবার আসার আগেই বলে দিতে পারি তোমাদেরকে কী খাবার দেওয়া হবে। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা ওহী মারফত আমাকে অনেক কিছু সম্পর্কেই অবগত করেন। বস্তুত তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়া। তারই ক্ষেত্র তৈরির জন্য তিনি তাদেরকে একথা বলেছিলেন। কেননা এর দ্বারা তাঁর আশা ছিল তারা তাঁর এ জ্ঞান সম্পর্কে অবহিত হলে তিনি যে-কথা বলবেন, তা লক্ষ্য করে শুনবে। এর দ্বারা বোঝা গেল, কাউকে যদি দীনী কোনও বিষয় জানানো উদ্দেশ্য হয়, তবে তার অন্তরে আস্থা সৃষ্টির জন্য তার কাছে নিজ জ্ঞানের কথা প্রকাশ করা যেতে পারে যদি না বড়ত্ব প্রকাশ লক্ষ্য থাকে।

আরো পড়ুন :-

স্মরণ শক্তি বৃদ্ধির দোয়া,মেধা বৃদ্ধির দোয়া,স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর দোয়া!নামাজের পর ২১ বাড় পড়ুন

দোয়াটি পড়লে সাথে সাথে রাগ কমে যায়, রাগ কমানোর দোয়া,শিশুদের রাগ কমানোর আমল

(ads1)

(getButton) #text=(আল কোরআন বাংলা অনুবাদ ) #file=(Al Quran Bangla) #icon=(download) #size=(25) #color=(#d10404) #info=(PDF Download)


৩৮


وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ ۚ مَا كَانَ لَنَا أَن نُّشْرِكَ بِاللَّهِ مِن شَيْءٍ ۚ ذَٰلِكَ مِن فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আমি আমার বাপ-দাদা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের দীন অনুসরণ করেছি। আমাদের এ অধিকার নেই যে, আল্লাহর সঙ্গে কোনও জিনিসকে শরীক করব। এটা (অর্থাৎ তাওহীদের আকীদা) আমাদের প্রতি ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহেরই অংশ। কিন্তু অধিকাংশ লোক (এ নি‘আমতের) শোকর আদায় করে না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি আপন পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্ম অনুসরণ করছি। আমাদের জন্য শোভা পায় না যে, কোন বস্তুকে আল্লাহর অংশীদার করি। এটা আমাদের প্রতি এবং অন্য সব লোকের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। কিন্ত অধিকাংশ লোক অনুগ্রহ স্বীকার করে না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘আমি আমার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইস্হাক এবং ইয়া‘ক‚বের মতবাদ অনুসরণ করি। আল্লাহ্ র সঙ্গে কোন বস্তুকে শরীক করা আমাদের কাজ নয়। এটা আমাদের ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহ্ র অনুগ্রহ; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।


৩৯


يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

হে আমার কারা-সংগীদ্বয়! ভিন্ন-ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না সেই এক আল্লাহ, যার ক্ষমতা সর্বব্যাপী?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হে কারাগারের সঙ্গীরা! পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘হে কারা-সঙ্গীদ্বয়! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ্ ?


৪০


مَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاءً سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَآبَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ ۚ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۚ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তাঁকে ছেড়ে তোমরা যার ইবাদত করছ, তার সারবত্তা কতগুলো নামের বেশি কিছু নয়, যা তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদাগণ রেখে দিয়েছ। আল্লাহ তার পক্ষে কোনও দলীল নাযিল করেননি। হুকুম দানের ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নেই। তিনিই এ হুকুম দিয়েছেন যে, তোমরা তার ভিন্ন অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল-সোজা পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের এবাদত কর, সেগুলো তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছে। আল্লাহ এদের কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও এবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘তাঁকে ছেড়ে তোমরা কেবল কতকগুলি নামের ‘ইবাদত করছো, যে নামগুলি তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ; এইগুলির কোন প্রমাণ আল্লাহ্ পাঠান নাই। বিধান দিবার অধিকার কেবল আল্লাহ্ র ই। তিনি আদেশ দিয়েছেন অন্য কারও ‘ইবাদত না করতে, কেবল তাঁর ব্যতীত; এটাই শাশ্বত দীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়।


৪১


يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبَّهُ خَمْرًا ۖ وَأَمَّا الْآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِن رَّأْسِهِ ۚ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

হে আমার কারা সঙ্গীদ্বয়! (এখন তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে নাও) তোমাদের একজনের ব্যাপার এই যে, (বন্দী দশা থেকে মুক্তি পেয়ে) সে নিজ মনিবকে মদ পান করাবে। আর থাকল অপরজন। তা তাকে শূলে চড়ানো হবে। ফলে পাখিরা তার মাথা (ঠুকরে ঠুকরে) খাবে। তোমরা যে বিষয়ে জিজ্ঞেস করছিলে তার ফায়সালা (এভাবে) হয়ে গেছে।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হে কারাগারের সঙ্গীরা! তোমাদের একজন আপন প্রভুকে মদ্যপান করাবে এবং দ্বিতীয়জন, তাকে শুলে চড়ানো হবে। অতঃপর তার মস্তক থেকে পাখী আহার করবে। তোমরা যে, বিষয়ে জানার আগ্রহী তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘হে কারা-সঙ্গীদ্বয়! তোমাদের দুইজনের একজন তার প্রভুকে মদ্য পান করাবে এবং অপরজন শূলবিদ্ধ হবে; এরপর তার মস্তক হতে পাখি আহার করবে। যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছ তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।’


৪২


وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ أَنَّهُ نَاجٍ مِّنْهُمَا اذْكُرْنِي عِندَ رَبِّكَ فَأَنسَاهُ الشَّيْطَانُ ذِكْرَ رَبِّهِ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সেই দু’জনের মধ্যে যার সম্পর্কে তার ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, ইউসুফ তাকে বলল, নিজ প্রভুর কাছে আমার কথাও বলো। ২৮ কিন্তু শয়তান তাকে নিজ প্রভুর কাছে ইউসুফের বিষয়ে বলার কথা ভুলিয়ে দিল। সুতরাং সে কয়েক বছর কারাগারে থাকল।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যে ব্যক্তি সম্পর্কে ধারণা ছিল যে, সে মুক্তি পাবে, তাকে ইউসুফ বলে দিলঃ আপন প্রভুর কাছে আমার আলোচনা করবে। অতঃপর শয়তান তাকে প্রভুর কাছে আলোচনার কথা ভুলিয়ে দিল। ফলে তাঁকে কয়েক বছর কারাগারে থাকতে হল।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ এদের মধ্যে যে মুক্তি পাবে মনে করল, তাকে বলল, ‘তোমার প্রভুর নিকট আমার কথা বল’, কিন্তু শয়তান একে এর প্রভুর নিকট তার বিষয় বলার কথা ভুলিয়ে দিল; সুতরাং ইউসুফ কয়েক বৎসর কারাগারে রইল।


তাফসীরঃ

২৮. ‘প্রভু’ বলে বাদশাহকে বোঝানো হয়েছে। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে বন্দী সম্পর্কে বলেছিলেন যে, সে মুক্তি লাভ করবে এবং ফিরে গিয়ে নিজ প্রভুকে যথারীতি মদ পান করাবে, তাকে বললেন, তুমি নিজ প্রভু অর্থাৎ, বাদশাহর কাছে আমার কথা বলো যে, একজন নিরপরাধ লোক জেলখানায় পড়ে রয়েছে। তার ব্যাপারে আপনার হস্তক্ষেপ করা উচিত। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা যে, সেই লোক বাদশাহকে এ কথা বলতে ভুলে গেল, যে কারণে তাঁকে কয়েক বছর পর্যন্ত কারাগারে পড়ে থাকতে হল।


৪৩


وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَىٰ سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ ۖ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِن كُنتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(কয়েক বছর পর মিসরের) বাদশাহ (তার পারিষদবর্গকে) বলল, আমি (স্বপ্নে) দেখলাম সাতটি মোটাতাজা গাভী, যাদেরকে সাতটি রোগা-পটকা গাভী খেয়ে ফেলছে। আরও দেখলাম সাতটি সবুজ-সজীব শীষ এবং আরও সাতটি শুকনো। হে পারিষদবর্গ! তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানলে আমার এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বাদশাহ বললঃ আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভী-এদেরকে সাতটি শীর্ণ গাভী খেয়ে যাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে পরিষদবর্গ! তোমরা আমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বল, যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাক।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

রাজা বলল, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভী, এদেরকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং দেখলাম সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পার তবে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও।’


৪৪


قَالُوا أَضْغَاثُ أَحْلَامٍ ۖ وَمَا نَحْنُ بِتَأْوِيلِ الْأَحْلَامِ بِعَالِمِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, (মনে হচ্ছে) এটা দুশ্চিন্তাপ্রসূত কল্পনা। আর আমরা স্বপ্ন-ব্যাখ্যার ইলমদার (-ও) নই। ২৯


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ এটা কল্পনাপ্রসূত স্বপ্ন। এরূপ স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘এটা অর্থহীন স্বপ্ন এবং আমরা এইরূপ স্বপ্ন ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ নই।’


তাফসীরঃ

২৯. বাদশাহ তার দেখা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু দরবারীগণ প্রথমে তো বলে দিল, এটা কোন অর্থবহ স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে না; অনেক সময় মনে অস্থিরতা বা দুঃশ্চিন্তা থাকলে ঘুমের ভেতর সেটাই স্বপ্নরূপে দেখা দেয়। তারপর আবার বলল, এটা অর্থবহ কোন স্বপ্ন হলেও আমাদের পক্ষে এর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। কেননা এ বিদ্যায় আমাদের দখল নেই।


৪৫


وَقَالَ الَّذِي نَجَا مِنْهُمَا وَادَّكَرَ بَعْدَ أُمَّةٍ أَنَا أُنَبِّئُكُم بِتَأْوِيلِهِ فَأَرْسِلُونِ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সেই দুই কয়েদীর মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পর যার (ইউসুফের কথা) স্মরণ হয়েছিল, সে বলল, আমি আপনাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিয়ে দিচ্ছি। সুতরাং আপনারা আমাকে (কারাগারে ইউসুফের কাছে) পাঠিয়ে দিন। ৩০


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

দু’জন কারারুদ্ধের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পর স্মরণ হলে, সে বলল, আমি তোমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলছি। তোমরা আমাকে প্রেরণ কর।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

দু’জন কারারুদ্ধের মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল এবং দীর্ঘকাল পরে যার স্মরণ হল সে বলল, ‘আমি এটার তাৎপর্য তোমাদেরকে জানিয়ে দিব। সুতরাং তোমরা আমাকে পাঠাও।’


তাফসীরঃ

৩০. এ হচ্ছে সেই বন্দী, যার স্বপ্নের ব্যাখ্যায় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, সে জেল থেকে মুক্তি লাভ করবে। তিনি তাকে তার মুক্তিকালে একথাও বলেছিলেন যে, তুমি তোমার প্রভুর কাছে আমার কথা বলো। কিন্তু সে তা বলতে ভুলে গিয়েছিল। বাদশাহ যখন নিজ স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন, তখন তার মনে পড়ল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে স্বপ্ন-ব্যাখ্যার বিশেষ জ্ঞান দান করেছেন। এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যাদান তাঁর পক্ষেই সম্ভব। তাই সে বাদশাহকে বলল, কারাগারে একজন লোক আছে। সে স্বপ্নের ভাল ব্যাখ্যা করতে পারে। আপনি আমাকে তার কাছে পাঠিয়ে দিন। কুরআন মাজীদ কোন গল্পগ্রন্থ নয়। এতে যে ঘটনা বর্ণিত হয়, তার বিশেষ কোন উদ্দেশ্য থাকে। এ কারণেই ঘটনা বর্ণনায় কুরআনী রীতি হয়, যেসব খুঁটিনাটি শ্রোতা নিজেই বুঝে নিতে সক্ষম, কুরআন তা বর্ণনা করে না। সুতরাং এখানেও পরিষ্কার শব্দে একথা বলার দরকার মনে করা হয়নি যে, তারপর বাদশাহ তাকে কারাগারে পাঠালেন। সেখানে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সঙ্গে তার সাক্ষাত হল এবং সে তাকে বলল...। বরং সরাসরি কথা শুরু করা হয়েছে এখান থেকে যে, ইউসুফ! ওহে সেই ব্যক্তি, যার সব কথা সত্য হয়।


৪৬


يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ أَفْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعِ سُنبُلَاتٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ لَّعَلِّي أَرْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(সুতরাং সে কারাগারে গিয়ে ইউসুফকে বলল) ইউসুফ! ওহে সেই ব্যক্তি, যার সব কথা সত্য হয়! তুমি আমাদেরকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও যে, সাতটি মোটাতাজা গাভী, যাদেরকে সাতটি রোগা-পটকা গাভী খেয়ে ফেলছে আর সাতটি সবুজ-সজীব শীষ এবং আরও সাতটি আছে, যা শুকনো, যাতে আমি লোকদের কাছে ফিরে যেতে পারি এবং (তাদেরকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানাতে পারি) যাতে তারা প্রকৃত বিষয় অবগত হতে পারে। ৩১


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

সে তথায় পৌঁছে বললঃ হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী! সাতটি মোটাতাজা গাভী-তাদেরকে খাচ্ছে সাতটি শীর্ণ গাভী এবং সাতটি সবুজ শীর্ষ ও অন্যগুলো শুষ্ক; আপনি আমাদেরকে এ স্বপ্ন সম্পর্কে পথনির্দেশ প্রদান করুনঃ যাতে আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের অবগত করাতে পারি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী! সাতটি স্থূলকায় গাভী, এদেরকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে তুমি আমাদেরকে ব্যাখ্যা দাও, যাতে আমি লোকদের নিকট ফিরে যেতে পারি ও যাতে তারা অবগত হতে পারে।’


তাফসীরঃ

৩১. প্রকৃত বিষয় অবগত হওয়া দ্বারা এটাও বোঝানো উদ্দেশ্য যে, তারা স্বপ্নের প্রকৃত ব্যাখ্যা জানতে পারবে এবং এটাও যে, তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবে। তারা বুঝতে সক্ষম হবে যে, বিনা দোষে এমন একজন সৎ ও ভালো লোককে কারাগারে ফেলে রাখা হয়েছে।


৪৭


قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَأَبًا فَمَا حَصَدتُّمْ فَذَرُوهُ فِي سُنبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تَأْكُلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ বলল, তোমরা একাধারে সাত বছর শস্য উৎপন্ন করবে। এ সময়ের ভেতর তোমরা যে শস্য সংগ্রহ করবে তা তার শীষসহ রেখে দিও, অবশ্য যে সামান্য পরিমাণ তোমাদের খাওয়ার কাজে লাগবে (তার কথা আলাদা)।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বললঃ তোমরা সাত বছর উত্তম রূপে চাষাবাদ করবে। অতঃপর যা কাটবে, তার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা খাবে তা ছাড়া অবশিষ্ট শস্য শীষ সমেত রেখে দেবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ বলল, ‘তোমরা সাত বৎসর একাদিক্রমে চাষ করবে, এরপর তোমরা যে শস্য কর্তন করবে এর মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করবে, তা ব্যতীত সমস্ত শীষসমেত রেখে দিবে;


৪৮


ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ سَبْعٌ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلَّا قَلِيلًا مِّمَّا تُحْصِنُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এরপর তোমাদের সামনে আসবে এমন সাতটি বছর, যা অত্যন্ত কঠিন হবে। তোমরা এই সাত বছরের জন্য যা সঞ্চয় করে রাখবে, তা খেতে থাকবে, অবশ্য যে সামান্য পরিমাণ তোমরা সংরক্ষণ করবে (কেবল তাই অবশিষ্ট থাকবে)।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং এরপরে আসবে দূর্ভিক্ষের সাত বছর; তোমরা এ দিনের জন্যে যা রেখেছিলে, তা খেয়ে যাবে, কিন্তু অল্প পরিমাণ ব্যতীত, যা তোমরা তুলে রাখবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘এটার পর আসবে সাতটি কঠিন বৎসর, এই সাত বৎসর, যা পূর্বে সঞ্চয় করে রাখবে, লোকে তা খাবে; কেবল সামান্য কিছু যা তোমরা সংরক্ষণ করবে, তা ব্যতীত।


৪৯


ثُمَّ يَأْتِي مِن بَعْدِ ذَٰلِكَ عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারপর আসবে এমন একটি বছর যখন মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং তখন তারা আঙ্গুরের রস নিংড়াবে। ৩২


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এর পরেই আসবে একবছর-এতে মানুষের উপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং এতে তারা রস নিঙড়াবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘এরপর আসবে এক বৎসর, সেই বৎসর মানুষের জন্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং সেই বৎসর মানুষ প্রচুর ফলের রস নিংড়াবে।’


তাফসীরঃ

৩২. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তার সারমর্ম ছিল এই যে, আগামী সাত বছর মওসুম ভালো থাকবে। ফলে লোকে বিপুল শস্য উৎপন্ন করতে পারবে। কিন্তু তারপর অনবরত সাত বছর খরা চলবে। স্বপ্নে যে সাতটি মোটাতাজা গাভী দেখা গেছে, তা দ্বারা সুদিনের সেই সাত বছর বোঝানো হয়েছে। আর রোগা-পটকা যে সাতটি গাভী দেখা গেছে, তা খরার সাত বছরের প্রতি ইঙ্গিত। এবার হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম খরার সাত বছরের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ এই ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিলেন যে, সুদিনের সাত বছর যে ফসল উৎপন্ন হবে, তা থেকে সামান্য পরিমাণ তো দৈনন্দিন খাদ্যের জন্য ব্যবহার করবে আর অবশিষ্ট সব ফসল তার শীষ সমেত রেখে দেবে, যাতে তা পচে-গলে নষ্ট না হয়। যখন খরার সাত বছর আসবে তখন এই সঞ্চিত শস্য কাজে আসবে। সেই সাত বছর লোকে এসব খেতে পারবে। আর স্বপ্নে যে দেখা গেছে সাতটি রোগা-পটকা গাভী সাতটি মোটাতাজা গাভীকে খেয়ে ফেলছে, তার দ্বারা একথাই বোঝানো হয়েছে যে, খরার সাত বছর সুদিনের সাত বছরে যে খাদ্য সঞ্চয় করা হয়েছিল তা খাওয়া হবে। অবশ্য সে সঞ্চয় থেকে সামান্য পরিমাণ শস্য বীজ হিসেবে রেখে দিতে হবে, যা পরবর্তীকালে চাষাবাদের কাজে আসবে। যখন খরার সাত বছর অতিক্রান্ত হবে, তার পরের বছর প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে। তখন মানুষ বেশি করে আঙ্গুরের রস সংগ্রহ করবে।


৫০


وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ ۖ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلَىٰ رَبِّكَ فَاسْأَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ اللَّاتِي قَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ ۚ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

বাদশাহ বলল, তাকে (অর্থাৎ ইউসুফকে) আমার কাছে নিয়ে এসো। সেমতে যখন তার কাছে দূত উপস্থিত হল, সে বলল, নিজ প্রভুর কাছে ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস কর, যে নারীগণ নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল তাদের অবস্থা কী? আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্পর্কে বেশ অবগত। ৩৩


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বাদশাহ বললঃ ফিরে যাও তোমাদের প্রভুর কাছে এবং জিজ্ঞেস কর তাকে ঐ মহিলার স্বরূপ কি, যারা স্বীয় হস্ত কর্তন করেছিল! আমার পালনকর্তা তো তাদের ছলনা সবই জানেন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

রাজা বলল, ‘তোমরা ইউসুফকে আমার নিকট নিয়ে আস।’ যখন দূত তার নিকট উপস্থিত হল তখন সে বলল, ‘তুমি তোমার প্রভুর নিকট ফিরে যাও এবং তাকে জিজ্ঞাসা কর, যে নারীগণ হাত কেটে ফেলেছিল তাদের অবস্থা কী! নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক তাদের ছলনা সম্যক অবগত।’


তাফসীরঃ

৩৩. এস্থলে কুরআন মাজীদ ঘটনার যে অংশ আপনা-আপনি বুঝে আসে তা লুপ্ত রেখেছে। অর্থাৎ, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা দিলেন, তা বাদশাহকে জানানো হল। বাদশাহ সে ব্যাখ্যা শুনে তাঁর মর্যাদা উপলব্ধি করলেন এবং তার নিদর্শনস্বরূপ তাঁকে নিজের কাছে ডেকে আনাতে চাইলেন। এতদুদ্দেশ্যে তিনি নিজের একজন দূতকে পাঠালেন। দূত হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাছে গিয়ে এ বার্তা পৌঁছালে তিনি চাইলেন প্রথমে তার উপর আরোপিত মিথ্যা অভিযোগের মীমাংসা হয়ে যাক এবং তিনি যে নির্দোষ এটা সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাক। সেমতে তিনি দূতের সঙ্গে না গিয়ে বরং বাদশাহর কাছে বার্তা পাঠালেন, যে সকল নারী নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিল আপনি প্রথমে তাদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিন। সেই নারীদের যেহেতু ঘটনার আদি-অন্ত জানা ছিল তাই প্রকৃত বিষয়টা তাদের মাধ্যমেই জানা সহজ ছিল। এ কারণেই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যুলায়খার পরিবর্তে তাদের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও এ সত্য জেল থেকে বের হওয়ার পরও উদ্ঘাটন করা যেত, কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি এ পন্থা অবলম্বন করেছিলেন সম্ভবত এজন্য যে, তিনি চাচ্ছিলেন, তিনি কতটা নির্দোষ তা বাদশাহ, আযীয ও অন্যান্যদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাক এবং তিনি যে নিজ নির্দোষিতার ব্যাপারে পরিপূর্ণ আত্মপ্রত্যয়ী, যদ্দরুণ নির্দোষিতা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত জেল থেকে বের হতে পর্যন্ত রাজি নন এটাও তারা বুঝতে পারুক। দ্বিতীয়ত বাদশাহর ভাব-গতি দ্বারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, তিনি তাকে বিশেষ কোন সম্মান দান করবেন। সেই সম্মান লাভের পর যদি ঘটনার তদন্ত করা হয়, তবে সে তদন্ত নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিতে পারে। এ কারণেই তিনি সমীচীন মনে করলেন, প্রথমে নিরপেক্ষ তদন্ত দ্বারা অভিযোগের সবটা কলঙ্ক ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাক, তারপরেই তিনি কারাগার থেকে বের হবেন। আল্লাহ তাআলা করলেনও তাই। বাদশাহর পরিপূর্ণ বিশ্বাস হয়ে গেল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম নির্দোষ ও নিষ্কলুষ। অতঃপর তিনি যখন সেই নারীদের ডাকলেন এবং তিনি যেন সবকিছু জানেন এই ভাব নিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তারা প্রকৃত সত্য অস্বীকার করতে পারল না। বরং তারা পরিষ্কার ভাষায় সাক্ষ্য দিল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সম্পূর্ণ নির্দোষ। এ পর্যায়ে আযীয-পত্নী যুলায়খাকেও স্বীকার করতে হল যে, প্রকৃতপক্ষে ভুল তারই ছিল। সম্ভবত আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ছিল যুলায়খাকে এই সুযোগ দেওয়া, যাতে সে নিজের অপরাধ স্বীকার ও তাওবার মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নিতে পারে।


৫১


قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدتُّنَّ يُوسُفَ عَن نَّفْسِهِ ۚ قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِن سُوءٍ ۚ قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ الْآنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدتُّهُ عَن نَّفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

বাদশাহ (সেই নারীদের ডাকিয়ে এনে তাদেরকে) বলল, তোমরা যখন ইউসুফকে ফুসলাচ্ছিলে তখন তোমাদের অবস্থা কী হয়েছিল? তারা বলল, আল্লাহ পানাহ! আমরা তার মধ্যে বিন্দুমাত্রও দোষ পাইনি। আযীযের স্ত্রী বলল, এবার সত্য কথা সকলের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমিই তাকে ফুসলানোর চেষ্টা করেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে সে সম্পূর্ণ সত্যবাদী।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বাদশাহ মহিলাদেরকে বললেনঃ তোমাদের হাল-হাকিকত কি, যখন তোমরা ইউসুফকে আত্মসংবরণ থেকে ফুসলিয়েছিলে? তারা বললঃ আল্লাহ মহান, আমরা তার সম্পর্কে মন্দ কিছু জানি না। আযীয-পত্মি বললঃ এখন সত্য কথা প্রকাশ হয়ে গেছে। আমিই তাকে আত্মসংবরণ থেকে ফুসলিয়েছিলাম এবং সে সত্যবাদী।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

রাজা নারীগণকে বলল, ‘যখন তোমরা ইউসুফ হতে অসৎ কর্ম কামনা করেছিলে, তখন তোমাদের কী হয়েছিল ?’ তারা বলল, ‘অদ্ভুত আল্লাহ্ র মাহাত্ম্য! আমরা এর মধ্যে কোন দোষ দেখি নাই।’ ‘আযীযের স্ত্রী বলল, ‘এক্ষণে সত্য প্রকাশ হল, আমিই তাকে ফুসলাইয়াছিলাম, নিশ্চয়ই সে তো সত্যবাদী।’


৫২


ذَٰلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(কারাগারে ইউসুফ যখন এসব কথা জানতে পারল তখন সে বলল) আমি এসব করেছি এজন্য, যাতে আযীয নিশ্চিতরূপে জানতে পারে আমি তার অনুপস্থিতিতে তার প্রতি কোন বিশ্বাসঘাতকতা করিনি এবং আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেন না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইউসুফ বললেনঃ এটা এজন্য, যাতে আযীয জেনে নেয় যে, আমি গোপনে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। আরও এই যে, আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের প্রতারণাকে এগুতে দেন না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এটা এইজন্যে যে, যাতে সে জানতে পারে, তার অনুপস্থিতিতে আমি তার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ্ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না।’


৫৩


۞ وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ۚ إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আমি এ দাবী করি না যে, আমার মন সম্পূর্ণ পাক পবিত্র। বস্তুত মন সর্বদা মন্দ কাজেরই আদেশ করে। অবশ্য আমার রব্ব যদি দয়া করেন সেটা ভিন্ন কথা (সে অবস্থায় মনের কোন চাতুর্য চলে না)। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। ৩৪


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্মপ্রবণ, কিন্তু সে নয়, যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’


তাফসীরঃ

৩৪. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম কোন পর্যায়ের বিনয়ী ছিলেন এবং কেমন ছিল তাঁর আবদিয়াত বা আল্লাহর প্রতি দাসত্ব-চেতনার মাত্রা, তা লক্ষ্য করুন। খোদ সেই নারীদের স্বীকারোক্তি দ্বারা যখন তাঁর নির্দোষিতা প্রমাণ হয়ে গেছে তখনও তিনি বিন্দুমাত্র নিজ মাহাত্ম্য প্রকাশ করছেন না; বরং কেমন বিনয়ের সঙ্গে বলছেন, আমি যে কঠিন ফাঁদ থেকে বেঁচে গেছি এটা আমার কিছু কৃতিত্ব নয়। মন তো আমারও আছে। মন সর্বদা মন্দ কাজেরই উস্কানি দেয়। প্রকৃতপক্ষে এটা আল্লাহ তাআলারই দয়া। তিনি যাকে চান তাকে মনের ছলনা থেকে রক্ষা করেন। অবশ্য অন্যান্য দলীল-প্রমাণ দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, আল্লাহ তাআলার এ দয়া ও রহমত কেবল সেই ব্যক্তির উপরই হয়, যে গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালায়, যেমন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম চালিয়েছিলেন। তিনি দৌঁড় দিয়ে দরজা পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। সেই সঙ্গে আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু হয়ে তাঁর আশ্রয়ও প্রার্থনা করেছিলেন।


৫৪


وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ أَسْتَخْلِصْهُ لِنَفْسِي ۖ فَلَمَّا كَلَّمَهُ قَالَ إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

বাদশাহ বলল, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে আমার একান্ত (সহযোগী) বানাব। সুতরাং যখন (ইউসুফ বাদশাহর কাছে আসল এবং) বাদশাহ তার সাথে কথা বলল, তখন বাদশাহ বলল, আজ থেকে তুমি আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাবান হলে, তোমার প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা রাখা হবে। ৩৫


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বাদশাহ বললঃ তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখব। অতঃপর যখন তার সাথে মতবিনিময় করল, তখন বললঃ নিশ্চয়ই আপনি আমার কাছে আজ থেকে বিশ্বস্ত হিসাবে মর্যাদার স্থান লাভ করেছেন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

রাজা বলল, ‘ইউসুফকে আমার নিকট নিয়ে আস; আমি তাকে আমার একান্ত সহচর নিযুক্ত করব।’ এরপর রাজা যখন তার সঙ্গে কথা বলল, তখন রাজা বলল, ‘আজ তুমি তো আমাদের নিকট মর্যাদাশীল, বিশ্বাসভাজন হলে।’


তাফসীরঃ

৩৫. বাদশাহ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সঙ্গে যেসব কথা বলেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ কোন কোন রিওয়ায়াতে এভাবে এসেছে যে, তিনি সর্বপ্রথম হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাছে সরাসরি তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। এ সময় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যায় এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা বাদশাহ অন্য কারও কাছে প্রকাশ করেননি। তিনি হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হন। অতঃপর হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম খরার বছরগুলোর জন্য আগাম ব্যবস্থা নেওযার জন্য বড় চমৎকার প্রস্তাবনা রাখেন, যা বাদশাহর খুব পছন্দ হয় এবং তিনি যে একজন বিচক্ষণ ও সাধু পুরুষ বাদশাহ সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যান। এক পর্যায়ে বাদশাহ তাকে বললেন, আপনার প্রতি যেহেতু আমার পূর্ণ আস্থা আছে, তাই এখন থেকে আপনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে গণ্য হবেন। তাছাড়া হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম দুর্ভিক্ষের প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিলেন, তা শুনে বাদশাহ বললেন, এটা আঞ্জাম দেবে কে? ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন, আমি এ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছি।


৫৫


قَالَ اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ বলল, আপনি আমাকে দেশের অর্থ-সম্পদের (ব্যবস্থাপনা) কার্যে নিযুক্ত করুন। নিশ্চিত থাকুন আমি রক্ষণাবেক্ষণ বেশ ভালো পারি এবং আমি (এ কাজের) পূর্ণ জ্ঞান রাখি। ৩৬


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইউসুফ বললঃ আমাকে দেশের ধন-ভান্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ বলল, ‘আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন; আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ।’


তাফসীরঃ

৩৬. সাধারণ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় কোন পদ নিজে চেয়ে নেওয়া শরীয়তে অনুমোদিত নয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা নিষেধ করেছেন। কিন্তু যদি সরকারি কোন পদ কোন অযোগ্য ব্যক্তির উপর ন্যস্ত হওয়ার কারণে মানুষের ক্ষতি হবে বলে প্রবল আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে এরূপ ঠেকা অবস্থায় সৎ, যোগ্য ও মুত্তাকী ব্যক্তির পক্ষে পদ প্রার্থনা করা জায়েয আছে। এস্থলে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের আশঙ্কা ছিল, আসন্ন দুর্ভিক্ষকালে মানুষ অন্যায়-অবিচারের সম্মুখীন হতে পারে। তাছাড়া সে দেশে আল্লাহ তাআলার আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের নিজের দায়িত্ব গ্রহণ ছাড়া কোনও উপায়ও ছিল না। এ কারণেই তিনি দেশের অর্থ বিভাগের দায়িত্ব নিজ মাথায় তুলে নেন। রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায়, বাদশাহ পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতা তাঁর উপর ন্যস্ত করেছিলেন। ফলে তিনি সারাটা দেশের শাসক হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, বাদশাহ তাঁর হাতে ইসলামও গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম কর্তৃক রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের ফলে গোটা দেশে আল্লাহ তাআলার ইনসাফভিত্তিক আইন জারি করা সম্ভব হয়েছিল।


৫৬


وَكَذَٰلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ يَتَبَوَّأُ مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ ۚ نُصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَن نَّشَاءُ ۖ وَلَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এবং এভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশে এমন ক্ষমতা দান করলাম যে, সে সে দেশের যেখানে ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত। আমি যাকে চাই নিজ রহমত দান করি এবং আমি পুণ্যবানদের কর্মফল নষ্ট করি না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এমনিভাবে আমি ইউসুফকে সে দেশের বুকে প্রতিষ্ঠা দান করেছি। সে তথায় যেখানে ইচ্ছা স্থান করে নিতে পারত। আমি স্বীয় রহমত যাকে ইচ্ছা পৌছে দেই এবং আমি পূণ্যবানদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এইভাবে ইউসুফকে আমি সেদেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম; সে সেদেশে যথা ইচ্ছা অবস্থান করতে পারত। আমি যাকে ইচ্ছা তার প্রতি দয়া করি; আমি সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করি না।


৫৭


وَلَأَجْرُ الْآخِرَةِ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

যারা ঈমান আনে ও তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের প্রতিদানই শ্রেয়। ৩৭


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং ঐ লোকদের জন্য পরকালে প্রতিদান উত্তম যারা ঈমান এনেছে ও সতর্কতা অবলম্বন করে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যারা মু’মিন এবং মুত্তাকী তাদের আখিরাতের পুরস্কারই উত্তম।


তাফসীরঃ

৩৭. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম দুনিয়ায় যে সম্মান ও ক্ষমতা লাভ করেছিলেন, কুরআন মাজীদ তার উল্লেখ করার সাথে সাথে এ বিষয়টাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আখেরাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য যে মহা প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন সে তুলনায় এটা অতি তুচ্ছ। এভাবে পার্থিব সম্মান ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রত্যেককে নসীহত করে দেওয়া হল যে, তার সদা-সর্বদা সতর্ক থাকা চাই, যাতে দুনিয়ার সম্মান ও ক্ষমতার কারণে আখেরাতের প্রতিদান বরবাদ না হয়।


৫৮


وَجَاءَ إِخْوَةُ يُوسُفَ فَدَخَلُوا عَلَيْهِ فَعَرَفَهُمْ وَهُمْ لَهُ مُنكِرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিল) ইউসুফের ভাইয়েরা আসল এবং তারা তার কাছে উপস্থিত হল। ৩৮ ইউসুফ তো তাদেরকে চিনে ফেলল, কিন্তু তারা তাকে চিনল না। ৩৯


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইউসুফের ভ্রাতারা আগমন করল, অতঃপর তার কাছে উপস্থিত হল। সে তাদেরকে চিনল এবং তারা তাকে চিনল না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফের ভাইগণ এলো এবং তার নিকট উপস্থিত হল। সে এদেরকে চিনল, কিন্তু এরা তাকে চিনতে পারল না।


তাফসীরঃ

৩৮. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তো তাদেরকে এ কারণে চিনতে পেরেছিলেন যে, তাদের চেহারা-সুরতে বিশেষ কোন পরিবর্তন হয়নি। তাছাড়া তারা যে রেশন নিতে আসবে এ আশাও তাঁর ছিল। কিন্তু ভাইয়েরা তাকে চিনতে পারেনি। কেননা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তারা দেখেছিল তাঁর সাত বছর বয়সকালে। ইতোমধ্যে তো তিনি অনেক বড় হয়ে গেছেন। তাছাড়া মিসরের সরকারি ভবনে তিনি থাকতে পারেন এটা তো তাদের কল্পনায়ও ছিল না।


৩৯. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে তাবীর দিয়েছিলেন, তাই ঘটল। মিসরে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দিল এবং একটানা সাত বছর তা স্থায়ী থাকল। আশপাশের দেশগুলোও সে দুর্ভিক্ষের আওতায় পড়ে গেল। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম মিসরের বাদশাহকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেন সুদিনের সাত বছর খাদ্য সঞ্চয়ের কর্মসূচী বজায় রাখা হয়। সঞ্চিত সে খাদ্য দুর্ভিক্ষের বছরগুলোতে কাজে আসবে। তখন যে আপনি দেশবাসীর কাছে স্বল্প মূল্যে খাদ্য বিক্রি করতে পারবেন তাই নয়; প্রতিবেশী দেশসমূহের লোকদেরও সাহায্য করতে পারবেন। দুর্ভিক্ষের কারণে দূর-দূরান্তের দেশসমূহেও খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের পিতা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এই সম্পূর্ণ কালটা ফিলিস্তিনের কিনআনেই অবস্থান করছিলেন। যখন কিনআনও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ল তখন তিনি ও তাঁর পুত্রগণ জানতে পারলেন মিসরের বাদশাহ দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকদের জন্য রেশন চালু করেছে। সেখান থেকে ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ খবর শোনার পর হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সৎ ভাইয়েরাও রেশনের জন্য মিসরে আসল। এরা ছিল দশজন। এরাই হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর শৈশবকালে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিল। বিনইয়ামীন নামে তাঁর একজন সহোদর ভাইও ছিল। তারা তাকে সঙ্গে আনেনি। পিতার কাছে রেখে এসেছিল। মিসরে রেশন বণ্টনের যাবতীয় কাজ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম স্বয়ং তদারকি করছিলেন, যাতে রেশন বণ্টনে কোনও অনিয়ম না হয়। ন্যায্যভাবে সকলেই তা পেয়ে যায়। এজন্য সকলকে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে হাজির হতে হত। সে অনুসারে ভাইদেরকেও তাঁর সামনে আসতে হল।


৫৯


وَلَمَّا جَهَّزَهُم بِجَهَازِهِمْ قَالَ ائْتُونِي بِأَخٍ لَّكُم مِّنْ أَبِيكُمْ ۚ أَلَا تَرَوْنَ أَنِّي أُوفِي الْكَيْلَ وَأَنَا خَيْرُ الْمُنزِلِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ যখন তাদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল, তখন সে তাদেরকে বলল, (আগামীতে) তোমরা তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকেও আমার কাছে নিয়ে এসো। ৪০ তোমরা কি দেখছ না আমি পরিমাপ-পাত্র ভরে ভরে দেই এবং আমি উত্তম অতিথিপরায়ণও বটে?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং সে যখন তাদেরকে তাদের রসদ প্রস্তুত করে দিল, তখন সে বললঃ তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকে আমার কাছে নিয়ে এসো। তোমরা কি দেখ না যে, আমি পুরা মাপ দেই এবং মেহমানদেরকে উত্তম সমাদার করি?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এবং সে যখন এদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল তখন সে বলল, ‘তোমরা আমার নিকট তোমাদের বৈমাত্রেয় ভাইকে নিয়ে আস। তোমরা কি দেখছ না যে, আমি মাপে পূর্ণমাত্রায় দেই এবং আমি উত্তম অতিথিপরায়ণ।


তাফসীরঃ

৪০. ঘটনা হয়েছিল এই যে, দশ ভাইয়ের প্রত্যেকে যখন মাথাপিছু একেক উট বোঝাই রসদ পেয়ে গেল, তখন তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে বলল, আমাদের একজন বৈমাত্রেয় ভাই আছে। আমাদের পিতার সেবার জন্য তার থাকার দরকার ছিল। তাই সে এখানে আসতে পারেনি। আপনি তার ভাগের রসদও আমাদেরকে দিয়ে দিন। এর জবাবে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন, রেশন বণ্টনের জন্য যে নীতিমালা স্থির করা হয়েছে, সে অনুসারে আমি এরূপ করতে পারি না। বরং পরের বার আপনারা যখন আসবেন, তখন তাকেও সঙ্গে নিয়ে আসবেন। তখন আমি প্রত্যেককে তার অংশ পুরোপুরি দিয়ে দেব। তখন যদি তাকে সঙ্গে না আনেন, তবে নিজেদের অংশও পাবেন না। কেননা তখন বোঝা যাবে আপনারা মিথ্যা দাবী করেছেন যে, আপনাদের আরও এক ভাই আছে। যারা এরূপ মিথ্যা বলে ধোঁকা দেয় তারা রেশন পেতে পারে না।


৬০


فَإِن لَّمْ تَأْتُونِي بِهِ فَلَا كَيْلَ لَكُمْ عِندِي وَلَا تَقْرَبُونِ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তোমরা যদি তাকে আমার কাছে নিয়ে না আস তবে আমার কাছে তোমাদের জন্য কোন রসদ থাকবে না। তখন তোমরা আমার কাছেও আসবে না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর যদি তাকে আমার কাছে না আন, তবে আমার কাছে তোমাদের কোন বরাদ্ধ নেই এবং তোমরা আমার কাছে আসতে পারবে না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘কিন্তু তোমরা যদি তাকে আমার নিকট নিয়ে না আস তবে আমার নিকট তোমাদের জন্যে কোন বরাদ্দ থাকবে না এবং তোমরা আমার নিকটবর্তী হবে না।


৬১


قَالُوا سَنُرَاوِدُ عَنْهُ أَبَاهُ وَإِنَّا لَفَاعِلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, আমরা তার বিষয়ে তার পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব, (যাতে তাকে আমাদের সাথে পাঠান) আর আমরা এটা অবশ্যই করব।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ আমরা তার সম্পর্কে তার পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমাদেরকে একাজ করতেই হবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘এর বিষয়ে আমরা এর পিতাকে সম্মত করার চেষ্টা করব এবং আমরা নিশ্চয়ই এটা করব।’


৬২


وَقَالَ لِفِتْيَانِهِ اجْعَلُوا بِضَاعَتَهُمْ فِي رِحَالِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَعْرِفُونَهَا إِذَا انقَلَبُوا إِلَىٰ أَهْلِهِمْ لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ তার ভৃত্যদেরকে বলে দিল, তারা যেন তাদের (অর্থাৎ ভাইদের) পণ্যমূল্য (যার বিনিময়ে তারা খাদ্য কিনেছে) তাদের মালপত্রের মধ্যে রেখে দেয়, ৪১ যাতে তারা নিজেদের পরিবারবর্গের কাছে ফিরে যাওয়ার পর তাদের পণ্যমূল্য চিনতে পারে। হয়ত (এই অনুগ্রহের কারণে) তারা পুনরায় আসবে।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং সে ভৃত্যদেরকে বললঃ তাদের পণ্যমূল্য তাদের রসদ-পত্রের মধ্যে রেখে দাও-সম্ভবতঃ তারা গৃহে পৌঁছে তা বুঝতে পারবে, সম্ভবতঃ তারা পুনর্বার আসবে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইউসুফ তার ভৃত্য-গণকে বলল, ‘এরা যে পণ্যমূল্য দিয়েছে তা এদের মালপত্রের মধ্যে রেখে দাও-যাতে স্বজনদের নিকট প্রত্যাবর্তনের পর এরা তা চিনতে পারে, তা হলে এরা পুনরায় আসতে পারে।’


তাফসীরঃ

৪১. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম ভাইদের প্রতি এই অনুকম্পা দেখালেন যে, তারা খাদ্য ক্রয়ের জন্য যে মূল্য দিয়েছিল, তা তাদের মালপত্রের মধ্যে ফেরত রেখে দিলেন। সেকালে সোনা-রুপার মুদ্রার প্রচলন ছিল না। পণ্যমূল্য হিসেবে বিভিন্ন মালামাল ব্যবহৃত হত। কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায়, তারা কিনআন থেকে কিছু চামড়া ও জুতা নিয়ে এসেছিল। পণ্যমূল্য হিসেবে তারা সেগুলোই পেশ করল। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম সেগুলোই তাদের মালপত্রের মধ্যে ফেরত রাখলেন। আর তিনি সম-পরিমাণ মূল্য যে নিজ পকেট থেকে সরকারি কোষাগারে জমা করেছিলেন, তা এমনিতেই বুঝে আসে।


৬৩


فَلَمَّا رَجَعُوا إِلَىٰ أَبِيهِمْ قَالُوا يَا أَبَانَا مُنِعَ مِنَّا الْكَيْلُ فَأَرْسِلْ مَعَنَا أَخَانَا نَكْتَلْ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

অতঃপর তারা যখন তাদের পিতার কাছে ফিরে আসল, তখন তারা বলল, আব্বাজী! আগামীতে আমাদেরকে খাদ্য দিতে অস্বীকার করা হয়েছে। ৪২ সুতরাং আপনি আমাদের সাথে আমাদের ভাই (বিনইয়ামীন)কে পাঠান, যাতে আমরা খাদ্য আনতে পারি। নিশ্চিত থাকুন আমরা তার পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করব।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা যখন তাদের পিতার কাছে ফিরে এল তখন বললঃ হে আমাদের পিতা, আমাদের জন্যে খাদ্য শস্যের বরাদ্দ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অতএব আপনি আমাদের ভাইকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন; যাতে আমরা খাদ্য শস্যের বরাদ্দ আনতে পারি এবং আমরা অবশ্যই তার পুরোপুরি হেফাযত করব।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর এরা যখন এদের পিতার নিকট ফিরে এলো, তখন এরা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের জন্যে বরাদ্দ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং আমাদের ভাইকে আমাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিন যাতে আমরা রসদ পেতে পারি। আমরা অবশ্যই তার রক্ষণা-বেক্ষণ করব।’


তাফসীরঃ

৪২. অর্থাৎ, আমরা বিনইয়ামীনকে নিয়ে না গেলে আমাদের কাউকেই রেশন দেওয়া হবে না।


৬৪


قَالَ هَلْ آمَنُكُمْ عَلَيْهِ إِلَّا كَمَا أَمِنتُكُمْ عَلَىٰ أَخِيهِ مِن قَبْلُ ۖ فَاللَّهُ خَيْرٌ حَافِظًا ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

পিতা বলল, আমি কি তার ব্যাপারে তোমাদের উপর সেই রকম নির্ভর করব, যে রকম নির্ভর ইতঃপূর্বে তার ভাই (ইউসুফ)-এর ব্যাপারে করেছিলাম? আচ্ছা! আল্লাহই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ রক্ষাকর্তা এবং তিনি সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দয়ালু।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বললেন, আমি তার সম্পর্কে তোমাদেরকে কি সেরূপ বিশ্বাস করব, যেমন ইতিপূর্বে তার ভাই সম্পর্কে বিশ্বাস করেছিলাম? অতএব আল্লাহ উত্তম হেফাযতকারী এবং তিনিই সর্বাধিক দয়ালু।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এর সম্বন্ধে সেরূপ বিশ্বাস করব, যেরূপ বিশ্বাস পূর্বে তোমাদেরকে করেছিলাম এর ভাই সম্বন্ধে ? আল্লাহ্ই রক্ষণাবেক্ষণে শ্রেষ্ঠ এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।’


৬৫


وَلَمَّا فَتَحُوا مَتَاعَهُمْ وَجَدُوا بِضَاعَتَهُمْ رُدَّتْ إِلَيْهِمْ ۖ قَالُوا يَا أَبَانَا مَا نَبْغِي ۖ هَـٰذِهِ بِضَاعَتُنَا رُدَّتْ إِلَيْنَا ۖ وَنَمِيرُ أَهْلَنَا وَنَحْفَظُ أَخَانَا وَنَزْدَادُ كَيْلَ بَعِيرٍ ۖ ذَٰلِكَ كَيْلٌ يَسِيرٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

যখন তারা তাদের মালপত্র খুলল, তখন দেখল, তাদের পণ্যমূল্যও ফেরত দেওয়া হয়েছে। তারা বলে উঠল, আব্বাজী! আমাদের আর কী চাই? এই যে আমাদের পণ্যমূল্যও আমাদেরকে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং (এবার) আমরা আমাদের পরিবারবর্গের জন্য (আরও) খাদ্য-সামগ্রী নিয়ে আসব, আমাদের ভাইকে হেফাজত করব এবং অতিরিক্ত এক উটের বোঝাও নিয়ে আসব। (এভাবে) এই অতিরিক্ত খাদ্য অতি সহজ। ৪৩


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং যখন তারা আসবাবপত্র খুলল, তখন দেখতে পেল যে, তাদেরকে তাদের পন্যমুল্য ফেরত দেয়া হয়েছে। তারা বললঃ হে আমাদের পিতা, আমরা আর কি চাইতে পারি। এই আমাদের প্রদত্ত পন্যমূল্য, আমাদেরকে ফেরত দেয়া হয়েছে। এখন আমরা আবার আমাদের পরিবারবর্গের জন্যে রসদ আনব এবং আমাদের ভাইয়ের দেখাশোনা করব এবং এক এক উটের বরাদ্দ খাদ্যশস্য আমরা অতিরিক্ত আনব। ঐ বরাদ্দ সহজ।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যখন এরা এদের মালপত্র খুলল তখন এরা দেখতে পেল এদের পণ্যমূল্য এদেরকে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে। এরা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা আর কি প্রত্যাশা করতে পারি ? এটা আমাদের প্রদত্ত পণ্যমূল্য, আমাদেরকে প্রত্যর্পণ করা হয়েছে। পুনরায় আমরা আমাদের পরিবারবর্গকে খাদ্য-সামগ্রী এনে দিব এবং আমরা আমাদের ভাইর রক্ষণাবেক্ষণ করব এবং আমরা অতিরিক্ত আর এক উষ্ট্রবোঝাই পণ্য আনব; যা এনেছি তা পরিমাণে অল্প।’


তাফসীরঃ

৪৩. অর্থাৎ ভাইয়ের জন্য যে অতিরিক্ত এক বোঝা পাওয়া যাবে তা দেওয়া মিসর রাজের পক্ষে অতি সহজ। অনেকে এর অর্থ করেছেন ‘আমরা যে রসদ নিয়ে এসেছি তা অতি সামান্য’ আমাদের প্রয়োজন অপেক্ষা কম। এই দুর্ভিক্ষের সময়ে এতে আমাদের কতদিন চলবে? আমাদের আরও অনেক রসদ দরকার, সেজন্য বিনইয়ামীনকে সঙ্গে যেতে হবে, নয়ত তারটা তো পাবই না, আমাদেরকেও নতুন কোন রসদ দেওয়া হবে না। -অনুবাদক


৬৬


قَالَ لَنْ أُرْسِلَهُ مَعَكُمْ حَتَّىٰ تُؤْتُونِ مَوْثِقًا مِّنَ اللَّهِ لَتَأْتُنَّنِي بِهِ إِلَّا أَن يُحَاطَ بِكُمْ ۖ فَلَمَّا آتَوْهُ مَوْثِقَهُمْ قَالَ اللَّهُ عَلَىٰ مَا نَقُولُ وَكِيلٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

পিতা বলল, আমি তাকে (বিন ইয়ামীনকে) তোমাদের সঙ্গে কিছুতেই পাঠাব না, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর নামে আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও যে, তাকে অবশ্যই আমার কাছে ফিরিয়ে আনবে, তবে তোমরা যদি (বাস্তবিকই) নিরুপায় হয়ে যাও (সেটা ভিন্ন কথা)। অবশেষে তারা যখন পিতাকে সেই প্রতিশ্রুতি দিল, তখন পিতা বলল, আমরা যা বলছি আল্লাহ তার তত্ত্বাবধায়ক।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বললেন, তাকে ততক্ষণ তোমাদের সাথে পাঠাব না, যতক্ষণ তোমরা আমাকে আল্লাহর নামে অঙ্গীকার না দাও যে, তাকে অবশ্যই আমার কাছে পৌঁছে দেবে; কিন্তু যদি তোমরা সবাই একান্তই অসহায় না হয়ে যাও। অতঃপর যখন সবাই তাঁকে অঙ্গীকার দিল, তখন তিনি বললেনঃ আমাদের মধ্যে যা কথাবার্তা হলো সে ব্যাপারে আল্লাহই মধ্যস্থ রইলেন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

পিতা বলল, ‘আমি একে কখনই তোমাদের সঙ্গে পাঠাব না যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহ্ র নামে অঙ্গীকার কর যে, তোমরা একে আমার নিকট নিয়ে আসবেই, অবশ্য যদি তোমরা একান্ত অসহায় হয়ে না পড়।’ এরপর যখন এরা তার নিকট প্রতিজ্ঞা করল তখন সে বলল, ‘আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি, আল্লাহ্ তার বিধায়ক।’


৬৭


وَقَالَ يَا بَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِن بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُّتَفَرِّقَةٍ ۖ وَمَا أُغْنِي عَنكُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ۖ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ ۖ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُتَوَكِّلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এবং (সেই সঙ্গে একথাও) বলল যে, হে আমার পুত্রগণ! তোমরা (নগরে) সকলে এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না; বরং ভিন্ন-ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। ৪৪ আমি তোমাদেরকে আল্লাহর ইচ্ছা হতে রক্ষা করতে পারব না। আল্লাহ ছাড়া কারও হুকুম কার্যকর হয় না, ৪৫ আমি তাঁরই উপর নির্ভর করেছি। আর যারা নির্ভর করতে চায় তাদের উচিত তাঁরই উপর নির্ভর করা।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইয়াকুব বললেনঃ হে আমার বৎসগণ! সবাই একই প্রবেশদ্বার দিয়ে যেয়ো না, বরং পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো। আল্লাহর কোন বিধান থেকে আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারি না। নির্দেশ আল্লাহরই চলে। তাঁরই উপর আমি ভরসা করি এবং তাঁরই উপর ভরসা করা উচিত ভরসাকারীদের।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা এক দ্বার দিয়ে প্রবেশ কর না, ভিন্ন ভিন্ন দ্বার দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহ্ র বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্যে কিছু করতে পারি না। বিধান আল্লাহ্ র ই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং যারা নির্ভর করতে চায় তারা আল্লাহ্ র ই ওপর নির্ভর করুক।’


তাফসীরঃ

৪৪. বদনজর থেকে বাঁচার কৌশল বলে দেওয়ার সাথে সাথে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এই পরম সত্যও তুলে ধরলেন যে, মানুষের কোনও কলা-কৌশলেরই নিজস্ব কোনও ক্ষমতা নেই। যা-কিছু হয়, আল্লাহ তাআলার হিকমত ও ইচ্ছাতেই হয়। তিনি চাইলে মানুষের গৃহীত ব্যবস্থার ভেতর কার্যকারিতা সৃষ্টি করেন কিংবা চাইলে তা নিষ্ফল করে দেন। সুতরাং একজন মুমিনের কর্তব্য সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার উপর নির্ভর করা, যদিও সে নিজ সাধ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণও করবে।


৪৫. হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাদের এরূপ আদেশ করেছিলেন এ কথা চিন্তা করে যে, এগার ভাইয়ের একটি দল, যারা মাশাআল্লাহ অত্যন্ত সুশ্রী ও স্বাস্থ্যবানও বটে, যদি একই সঙ্গে নগরে প্রবেশ করে, তবে বদনজর লেগে যেতে পারে।


৬৮


وَلَمَّا دَخَلُوا مِنْ حَيْثُ أَمَرَهُمْ أَبُوهُم مَّا كَانَ يُغْنِي عَنْهُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ إِلَّا حَاجَةً فِي نَفْسِ يَعْقُوبَ قَضَاهَا ۚ وَإِنَّهُ لَذُو عِلْمٍ لِّمَا عَلَّمْنَاهُ وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা (ভাইগণ!) যখন তাদের পিতার আদেশ মত (নগরে) প্রবেশ করল, তখন তাদের সে কৌশল আল্লাহর ইচ্ছা হতে তাদেরকে আদৌ রক্ষা করার ছিল না। তবে ইয়াকুবের অন্তরে একটা অভিপ্রায় ছিল, যা সে পূর্ণ করল। নিশ্চয়ই সে আমার শেখানো জ্ঞানের ধারক ছিল। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ (প্রকৃত বিষয়) জানে না। ৪৬


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা যখন পিতার কথামত প্রবেশ করল, তখন আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে তা তাদের বাঁচাতে পারল না। কিন্তু ইয়াকুবের সিদ্ধান্তে তাঁর মনের একটি বাসনা ছিল, যা তিনি পূর্ণ করেছেন। এবং তিনি তো আমার শেখানো বিষয় অবগত ছিলেন। কিন্তু অনেক মানুষ অবগত নয়।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যখন তারা, তাদের পিতা তাদেরকে যেভাবে আদেশ করেছিল, সেইভাবেই প্রবেশ করল, তখন আল্লাহ্ র বিধানের বিরুদ্ধে তা তাদের কোন কাজে এলো না; ইয়া‘ক‚ব কেবল তার মনের একটি অভিপ্রায় পূর্ণ করেছিল এবং সে অবশ্যই জ্ঞানী ছিল, কারণ আমি তাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ এটা অবগত নয়।


তাফসীরঃ

৪৬. অর্থাৎ, বহু লোক হয় নিজেদের বাহ্যিক কলা-কৌশলকেই প্রকৃত কার্যবিধায়ক মনে করে অথবা তার উপর এতটা নির্ভর করে যে, তখন আর আল্লাহ তাআলার ক্ষমতার প্রতি তাদের নজর থাকে না। চিন্তা করে না যে, আল্লাহ তাআলা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সে কলা-কৌশলে ক্ষমতা সৃষ্টি না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তা ফলপ্রসূ হতে পারে না। কিন্তু হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম এরূপ ছিলেন না। তিনি যখন তাঁর পুত্রদেরকে বদনজর থেকে বাঁচার কৌশল বলে দিলেন, যাকে আয়াতে তার মনের হাজত বা অভিপ্রায় শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে, তখন সেই সঙ্গে একথাও জানিয়ে দিলেন যে, এটা কেবলই একটা ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে উপকার ও ক্ষতি সাধনের এখতিয়ার আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কারও নেই। সুতরাং তাদের সে ব্যবস্থা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় বদনজর থেকে বাঁচার ব্যাপারে তো ফলপ্রসূ হল, কিন্তু আল্লাহ তাআলারই ইচ্ছায় তারা অপর এক সঙ্কটে পড়ে গেল, যার বিবরণ সামনে আসছে।


৬৯


وَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَخَاهُ ۖ قَالَ إِنِّي أَنَا أَخُوكَ فَلَا تَبْتَئِسْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

যখন তারা ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার (সহোদর) ভাই (বিনইয়ামীন)কে নিজের কাছে বিশেষ স্থান দিল। ৪৭ (এবং তাকে) বলল, আমি তোমার ভাই। অতএব তারা (অন্য ভাইয়েরা) যা করত তার জন্য দুঃখ করো না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যখন তারা ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, তখন সে আপন ভ্রাতাকে নিজের কাছে রাখল। বললঃ নিশ্চই আমি তোমার সহোদর। অতএব তাদের কৃতকর্মের জন্যে দুঃখ করো না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা যখন ইউসুফের সামনে উপস্থিত হল, তখন ইউসুফ তার সহোদরকে নিজের কাছে রাখলো এবং বলল, ‘নিশ্চয়ই আমিই তোমার সহোদর, সুতরাং এরা যা করত তার জন্যে দুঃখ কর না।’


তাফসীরঃ

৪৭. বিভিন্ন রিওয়ায়াতে আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম একেকটি কক্ষে দু’-দু’জন ভাইকে থাকতে দিয়েছিলেন। এভাবে দশ ভাই পাঁচটি কক্ষে অবস্থান গ্রহণ করল। বাকি থেকে গেল বিনইয়ামীন। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম বললেন, এই একজন আমার সঙ্গে থাকবে। এভাবে সহোদর ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর একান্তে মিলিত হওয়ার সুযোগ মিলে গেল। তখন তিনি তাকে জানিয়ে দিলেন যে, আমি তোমার আপন ভাই। বিনইয়ামীন বলল, তাহলে আমি আর তাদের সাথে ফিরে যাব না। তার এ অভিপ্রায় পূরণের জন্য হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যে কৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তার বিবরণ সামনে আসছে।


৭০


فَلَمَّا جَهَّزَهُم بِجَهَازِهِمْ جَعَلَ السِّقَايَةَ فِي رَحْلِ أَخِيهِ ثُمَّ أَذَّنَ مُؤَذِّنٌ أَيَّتُهَا الْعِيرُ إِنَّكُمْ لَسَارِقُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

অতঃপর ইউসুফ যখন তাদের রসদের ব্যবস্থা করে দিল, তখন পানি পান করার পেয়ালা নিজ (সহোদর) ভাইয়ের মালপত্রের মধ্যে রেখে দিল। তারপর এক ঘোষক চীৎকার করে বলল, ওহে যাত্রীদল! তোমরা নিশ্চয়ই চোর। ৪৮


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর যখন ইউসুফ তাদের রসদপত্র প্রস্তুত করে দিল, তখন পানপাত্র আপন ভাইয়ের রসদের মধ্যে রেখে দিল। অতঃপর একজন ঘোষক ডেকে বললঃ হে কাফেলার লোকজন, তোমরা অবশ্যই চোর।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর সে যখন এদের সামগ্রীর ব্যবস্থা করে দিল, তখন সে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্যে পানপাত্র রেখে দিল। এরপর এক আহŸায়ক চিৎকার করে বলল, ‘হে যাত্রীদল! তোমরা নিশ্চয়ই চোর।’


তাফসীরঃ

৪৮. এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাদের মালপত্রের ভেতর নিজের পক্ষ থেকেই পেয়ালা রেখে দেওয়ার পর এতটা নিশ্চয়তার সাথে তাদেরকে চোর সাব্যস্ত করাটা কিভাবে জায়েয হতে পারে? এ প্রশ্নের বিভিন্ন উত্তর দেওয়া হয়েছে। যেমন কেউ কেউ বলেন, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম পেয়ালা রেখেছিলেন অতি গোপনে। তারপর কর্মচারীরা যখন সেটি খুঁজে পেল না, তখন তারা নিজেদের তরফ থেকেই তাদেরকে চোর সাব্যস্ত করল। তারা এটা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের হুকুমে করেনি। কিন্তু কুরআন মাজীদ ঘটনাটি এখানে যেভাবে বর্ণনা করেছে, তার পূর্বাপর অবস্থা দৃষ্টে এ সম্ভাবনাটি অত্যন্ত দূরের মনে হয়। কতিপয় মুফাসসিরের অভিমত হল, তাদেরকে চোর সাব্যস্ত করা হয়েছিল অপর একটি ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে। তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর শৈশবে পিতার নিকট থেকে চুরি করেছিল। সে হিসেবেই তাদেরকে চোর বলা হয়েছে। আবার অপর একদল মুফাসসিরের মতে যেহেতু স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই ইউসুফ আলাইহিস সালামকে এ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন, যেমন সামনে ৭৬ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেছেন, ‘এভাবে আমি ইউসুফের জন্য এ কৌশলটি করেছিলাম; তাই যা-কিছু হয়েছিল তা আল্লাহ তাআলার হুকুমেই হয়েছিল। সুতরাং এ নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ নেই। এটা সূরা কাহাফে বর্ণিত হযরত খাযির আলাইহিস সালামের ঘটনার মত। তাতে তিনি কয়েকটি কাজ এমন করেছিলেন, যা বাহ্যত শরীয়ত বিরোধী ছিল, কিন্তু তা যেহেতু আল্লাহ তাআলার তাকবীনী (অদৃশ্য রহস্য-জগতীয়) হুকুমে হয়েছিল, তাই জায়েয ছিল। এস্থলেও হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাজটিও সে রকমেরই।


৭১


قَالُوا وَأَقْبَلُوا عَلَيْهِم مَّاذَا تَفْقِدُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা তাদের দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল, তোমরা কী বস্তু হারিয়েছ?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা ওদের দিকে মুখ করে বললঃ তোমাদের কি হারিয়েছে?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা তাদের দিকে ফিরে বলল, ‘তোমরা কী হারিয়েছ ?’


৭২


قَالُوا نَفْقِدُ صُوَاعَ الْمَلِكِ وَلِمَن جَاءَ بِهِ حِمْلُ بَعِيرٍ وَأَنَا بِهِ زَعِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, আমরা বাদশাহর পানপাত্র পাচ্ছি না। ৪৯ যে ব্যক্তি সেটি এনে দেবে, সে এক উটের বোঝা (পুরস্কার) পাবে। আমি তার (পুরস্কার প্রাপ্তির) জামিন।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ আমরা বাদশাহর পানপাত্র হারিয়েছি এবং যে কেউ এটা এনে দেবে সে এক উটের বোঝা পরিমাণ মাল পাবে এবং আমি এর যামিন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তারা বলল, ‘আমরা রাজার পানপাত্র হারিয়েছি; যে তা এনে দিবে সে এক উষ্ট্রবোঝাই মাল পাবে এবং আমি এর জামিন।’


তাফসীরঃ

৪৯. এটা ছিল রাজকীয় পানপাত্র এবং বোঝাই যাচ্ছে অতি মূল্যবান ছিল। তা না হলে তার তালাশে এতটা মেহনত করা হত না।


৭৩


قَالُوا تَاللَّهِ لَقَدْ عَلِمْتُم مَّا جِئْنَا لِنُفْسِدَ فِي الْأَرْضِ وَمَا كُنَّا سَارِقِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা (ভাইয়েরা) বলল, আল্লাহর কসম! আপনারা জানেন, আমরা দেশে ফাসাদ বিস্তার করার জন্য আসিনি এবং আমরা চোরও নই।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ আল্লাহর কসম, তোমরা তো জান, আমরা অনর্থ ঘটাতে এদেশে আসিনি এবং আমরা কখনও চোর ছিলাম না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘আল্লাহ্ র শপথ! তোমরা তো জান আমরা এই দেশে দুষ্কৃতি করতে আসি নাই এবং আমরা চোরও নই।’


৭৪


قَالُوا فَمَا جَزَاؤُهُ إِن كُنتُمْ كَاذِبِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, তোমরা যদি মিথ্যাবাদী (প্রমাণিত) হও, তবে তার শাস্তি কী হবে?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও, তবে যে, চুরি করেছে তার কি শাস্তি?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তারা বলল, ‘যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও তবে তার শাস্তি কী ?


৭৫


قَالُوا جَزَاؤُهُ مَن وُجِدَ فِي رَحْلِهِ فَهُوَ جَزَاؤُهُ ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, তার শাস্তি এই যে, যার মালপত্রের মধ্যে সেটি (পেয়ালাটি) পাওয়া যাবে শাস্তি স্বরূপ সেই ধৃত হবে। যারা জুলুম করে, আমরা তাদেরকে এ রকমই শাস্তি দিয়ে থাকি। ৫০


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ এর শাস্তি এই যে, যার রসদপত্র থেকে তা পাওয়া যাবে, এর প্রতিদানে সে দাসত্বে যাবে। আমরা যালেমদেরকে এভাবেই শাস্তি দেই।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘এটার শাস্তি যার মালপত্রের মধ্যে পাত্রটি পাওয়া যাবে, সে-ই তার বিনিময়।’ এভাবে আমরা সীমালংঘনকারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।


তাফসীরঃ

৫০. অর্থাৎ, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের শরীয়তে চুরির শাস্তি এটাই যে, যে ব্যক্তি চুরি করবে তাকে গ্রেফতার করে রেখে দেওয়া হবে। এভাবে আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভাইদের দ্বারাই বলিয়ে দিলেন যে, চোরের এ রকম শাস্তিই প্রাপ্য। সুতরাং যে শাস্তি দেওয়া হল তা হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের শরীয়ত মোতাবেকই দেওয়া হল। না হয় বাদশাহর আইনে এ শাস্তি দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কেননা তার আইন অনুযায়ী চোরকে বেত্রাঘাত করা হত এবং তার উপর জরিমানা আরোপ করা হত। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম শাস্তি সম্পর্কে তাঁর ভাইদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন এ লক্ষ্যেই, যাতে তাকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের শরীয়তের বিপরীতে ফায়সালা দিতে না হয়। আবার সেই সঙ্গে ভাইকেও নিজের কাছে রাখার সুযোগ মিলে যায়।


৭৬


فَبَدَأَ بِأَوْعِيَتِهِمْ قَبْلَ وِعَاءِ أَخِيهِ ثُمَّ اسْتَخْرَجَهَا مِن وِعَاءِ أَخِيهِ ۚ كَذَٰلِكَ كِدْنَا لِيُوسُفَ ۖ مَا كَانَ لِيَأْخُذَ أَخَاهُ فِي دِينِ الْمَلِكِ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ ۚ نَرْفَعُ دَرَجَاتٍ مَّن نَّشَاءُ ۗ وَفَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারপর ইউসুফ তার (সহোদর) ভাইয়ের থলি তল্লাশির আগে অন্য ভাইদের থলি তল্লাশি শুরু করল। তারপর পেয়ালাটি নিজ (সহোদর) ভাইয়ের থলি থেকে বের করে আনল। ৫১ এভাবে আমি ইউসুফের জন্য কৌশল করলাম। আল্লাহর এই ইচ্ছা না হলে বাদশাহর আইন অনুযায়ী ইউসুফের পক্ষে তার ভাইকে নিজের কাছে রাখা সম্ভব ছিল না। আমি যাকে ইচ্ছা করি তার মর্যাদা উঁচু করি। আর যত জ্ঞানী আছে, তাদের সকলের উপর আছেন একজন সর্বজ্ঞানী। ৫২


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর ইউসুফ আপন ভাইদের থলের পূর্বে তাদের থলে তল্লাশী শুরু করলেন। অবশেষে সেই পাত্র আপন ভাইয়ের থলের মধ্য থেকে বের করলেন। এমনিভাবে আমি ইউসুফকে কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম। সে বাদশাহর আইনে আপন ভাইকে কখনও দাসত্বে দিতে পারত না,যদি আল্লাহ ইচ্ছা না করেন । আমি যাকে ইচ্ছা, মর্যাদায় উন্নীত করি এবং প্রত্যেক জ্ঞানীর উপরে আছে অধিকতর এক জ্ঞানীজন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর সে তার সহোদরের মালপত্র তল্লাশির পূর্বে এদের মালপত্র তল্লাশি করতে লাগল, পরে তার সহোদরের মালপত্রের মধ্য হতে পাত্রটি বের করল। এভাবে আমি ইউসুফের জন্যে কৌশল করেছিলাম। রাজার আইনে তার সহোদরকে সে আটক করতে পারত না, আল্লাহ্ ইচ্ছা না করলে। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদায় উন্নীত করি। প্রত্যেক জ্ঞানবান ব্যক্তির ওপর আছেন সর্বজ্ঞানী।


তাফসীরঃ

৫১. ভাইয়েরা বড় খুশী হয়ে গিয়েছিল। মনে করেছিল তারা যা চেয়েছিল তাই হয়েছে। কিন্তু তাদের খবর ছিল না ঘটনাক্রম কোন দিকে গড়ায়। যে যত বড় জ্ঞানী হওয়ারই দাবী করুক, আল্লাহ তাআলার জ্ঞান নিঃসন্দেহে সকলের উপরে।


৫২. তল্লাশিকে যাতে নিরপেক্ষ মনে করা হয়, সেজন্য প্রথমে অন্যান্য ভাইদের থেকে শুরু করলেন।


৭৭


۞ قَالُوا إِن يَسْرِقْ فَقَدْ سَرَقَ أَخٌ لَّهُ مِن قَبْلُ ۚ فَأَسَرَّهَا يُوسُفُ فِي نَفْسِهِ وَلَمْ يُبْدِهَا لَهُمْ ۚ قَالَ أَنتُمْ شَرٌّ مَّكَانًا ۖ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا تَصِفُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ভাইয়েরা বলল, যদি সে (বিন ইয়ামীন) চুরি করে তবে (আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা) এর আগে তার ভাইও চুরি করেছিল। ৫৩ তখন ইউসুফ তাদের কাছে প্রকাশ না করে চুপিসারে (মনে মনে) বলল, এ ব্যাপারে তোমরা তো ঢের বেশি মন্দ ৫৪ আর তোমরা যা বলছ তার প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বলতে লাগলঃ যদি সে চুরি করে থাকে, তবে তার এক ভাইও ইতিপূর্বে চুরি করেছিল। তখন ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে রাখলেন এবং তাদেরকে জানালেন না। মনে মনে বললেনঃ তোমরা লোক হিসাবে নিতান্ত মন্দ এবং আল্লাহ খুব জ্ঞাত রয়েছেন, যা তোমরা বর্ণনা করছ;


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘সে যদি চুরি করে থাকে তবে তার সহোদরও তো পূর্বে চুরি করেছিল।’ কিন্তু ইউসুফ প্রকৃত ব্যাপার নিজের মনে গোপন রাখলো এবং এদের নিকট প্রকাশ করল না; সে মনে মনে বলল, ‘তোমাদের অবস্থা তো হীনতর এবং তোমরা যা বলছ সে সম্বন্ধে আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত।’


তাফসীরঃ

৫৩. অর্থাৎ, যেই চুরিকর্ম সম্পর্কে তোমরা আমার প্রতি অপবাদ লাগাচ্ছ, সে ব্যাপারে তোমাদের অবস্থা তো অনেক বেশি মন্দ। কেননা তোমরা তো খোদ আমাকেই আমার পিতার নিকট থেকে চুরি করে কুয়ায় ফেলে দিয়েছিলে।


৫৪. তারা এর দ্বারা বোঝাচ্ছিল যে, বিনইয়ামীনের ভাই অর্থাৎ, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামও, একবার চুরি করেছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, তারা তাঁর প্রতি এই অপবাদ কেন দিল? কুরআন মাজীদ এর কোনও কারণ বর্ণনা করেনি। কিন্তু কোন কোন রিওয়ায়াতে আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম শৈশবেই মাতৃহারা হয়েছিলেন। তাঁকে লালন-পালন করেছিলেন তাঁর ফুফু। কেননা শিশু যখন খুব বেশি ছোট থাকে, তখন তার দেখাশোনার জন্য কোনও নারীরই দরকার পড়ে। যখন তিনি একটু বড় হয়ে উঠলেন, তখন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাকে নিজের কাছে এনে রাখতে চাইলেন। কিন্তু ইত্যবসরে তাঁর প্রতি ফুফুর স্নেহ-মমতা এতটাই গভীর হয়ে উঠেছিল যে, তাকে চোখের আড়াল করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই তিনি এই কৌশল করলেন যে, নিজের একটা কোমরবন্দ তার কোমরে বেঁধে প্রচার করে দিলেন সেটি চুরি হয়ে গেছে। পরে যখন সেটি হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কোমরে পাওয়া গেল, তখন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের শরীয়ত মোতাবেক বিচার করা হল এবং তাতে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তার নিজের কাছে রেখে দেওয়ার অধিকার লাভ হল। সুতরাং সেই ফুফু যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে তাঁর কাছেই থাকতে হল। তার ওফাতের পর তিনি পিতা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের কাছে চলে আসেন। এ ঘটনাটি তাঁর ভাইদের জানা ছিল। তারা এটাও জানত যে, কোমরবন্দটি প্রকৃতপক্ষে তিনি চুরি করেননি। কিন্তু তারা যেহেতু হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের বিরোধী ছিল, তাই তারা সুযোগ পেয়ে তার উপর চুরির অপবাদ লাগিয়ে দিল (ইবনে কাছীর ও অন্যান্য)। কিন্তু মুশকিল হল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের মা তাঁর শৈশবকালেই মারা গিয়েছিলেন, না তিনি জীবিত ছিলেন সে সম্পর্কে বর্ণনা দু’রকমের। যেসব বর্ণনায় তাঁর শৈশবকালে মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে যদি বিশুদ্ধ সাব্যস্ত করা যায়, তবে সে হিসেবে উপরিউক্ত ঘটনাটি সঠিক হওয়া সম্ভব। কিন্তু যেসব বর্ণনায় আছে তিনি জীবিত ছিলেন, সে হিসেবে চুরির অপবাদ দানের এ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। যাই হোক না কেন এতটুকু বিষয় স্পষ্ট যে, তাদের সে অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল।


৭৮


قَالُوا يَا أَيُّهَا الْعَزِيزُ إِنَّ لَهُ أَبًا شَيْخًا كَبِيرًا فَخُذْ أَحَدَنَا مَكَانَهُ ۖ إِنَّا نَرَاكَ مِنَ الْمُحْسِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(এবার) তারা বলতে লাগল, হে আযীয! এর অতিশয় বৃদ্ধ এক পিতা আছেন। কাজেই তার পরিবর্তে আমাদের মধ্য হতে কাউকে আপনার কাছে রেখে দিন। যারা সদয় আচরণ করে আমরা আপনাকে তাদের একজন মনে করি।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বলতে লাগলঃ হে আযীয, তার পিতা আছেন, যিনি খুবই বৃদ্ধ বয়স্ক। সুতরাং আপনি আমাদের একজনকে তার বদলে রেখে দিন। আমরা আপনাকে অনুগ্রহশীল ব্যক্তিদের একজন দেখতে পাচ্ছি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘হে ‘আযীয! এর পিতা তো অতিশয় বৃদ্ধ; সুতরাং এর স্থলে আপনি আমাদের একজনকে রাখুন। আমরা তো আপনাকে দেখছি মহানুভব ব্যক্তিদের একজন।’


৭৯


قَالَ مَعَاذَ اللَّهِ أَن نَّأْخُذَ إِلَّا مَن وَجَدْنَا مَتَاعَنَا عِندَهُ إِنَّا إِذًا لَّظَالِمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ বলল, এর থেকে (অর্থাৎ এই বে-ইনসাফী থেকে) আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি যে, যে ব্যক্তির কাছে আমাদের মাল পাওয়া গেছে তার পরিবর্তে অন্য কাউকে পাকড়াও করব। আমরা এরূপ করলে নিশ্চিতভাবেই আমরা জালিম হয়ে যাব।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি বললেনঃ যার কাছে আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া আর কাউকে গ্রেফতার করা থেকে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন। তা হলে তো আমরা নিশ্চিতই অন্যায়কারী হয়ে যাব।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘যার নিকট আমরা আমাদের মাল পেয়েছি, তাকে ছাড়া অন্যকে রাখার অপরাধ হতে আমরা আল্লাহ্ র শরণ নিচ্ছি। এইরূপ করলে আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী হব।’


৮০


فَلَمَّا اسْتَيْأَسُوا مِنْهُ خَلَصُوا نَجِيًّا ۖ قَالَ كَبِيرُهُمْ أَلَمْ تَعْلَمُوا أَنَّ أَبَاكُمْ قَدْ أَخَذَ عَلَيْكُم مَّوْثِقًا مِّنَ اللَّهِ وَمِن قَبْلُ مَا فَرَّطتُمْ فِي يُوسُفَ ۖ فَلَنْ أَبْرَحَ الْأَرْضَ حَتَّىٰ يَأْذَنَ لِي أَبِي أَوْ يَحْكُمَ اللَّهُ لِي ۖ وَهُوَ خَيْرُ الْحَاكِمِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা যখন ইউসুফের দিক থেকে সম্পূর্ণ হতাশ হয়ে গেল, তখন নির্জনে গিয়ে চুপিসারে পরামর্শ করতে লাগল। তাদের মধ্যে যে সকলের বড় ছিল সে বলল, তোমাদের কি জানা নেই তোমাদের পিতা তোমাদের থেকে আল্লাহর নামে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন? এবং এর আগে ইউসুফের ব্যাপারে তোমরা যে ত্রুটি করেছিলে (তাও তোমাদের জানা আছে)। সুতরাং আমি তো এ দেশ ত্যাগ করব না, যাবৎ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন কিংবা আল্লাহই আমার ব্যাপারে কোনও ফায়সালা করে দেন। তিনিই সর্বাপেক্ষা উত্তম ফায়সালাকারী।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর যখন তারা তাঁর কাছ থেকে নিরাশ হয়ে গেল, তখন পরামর্শের জন্যে এখানে বসল। তাদের জ্যেষ্ঠ ভাই বললঃ তোমরা কি জান না যে, পিতা তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং পূর্বে ইউসুফের ব্যাপারেও তোমরা অন্যায় করেছো? অতএব আমি তো কিছুতেই এদেশ ত্যাগ করব না, যে পর্যন্ত না পিতা আমাকে আদেশ দেন অথবা আল্লাহ আমার পক্ষে কোন ব্যবস্থা করে দেন। তিনিই সর্বোত্তম ব্যবস্থাপক।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যখন এরা তার নিকট হতে সম্পূর্ণ নিরাশ হল, তখন এরা নির্জনে গিয়া পরামর্শ করতে লাগল। এদের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি বলল, ‘তোমরা কি জান না যে, তোমাদের পিতা তোমাদের নিকট হতে আল্লাহ্ র নামে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং পূর্বেও তোমরা ইউসুফের ব্যাপারে ত্রুটি করেছিলে ? সুতরাং আমি কিছুতেই এই দেশ ত্যাগ করব না, যতক্ষণ না আমার পিতা আমাকে অনুমতি দেন বা আল্লাহ্ আমার জন্যে কোন ব্যবস্থা করেন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ বিচারক।


৮১


ارْجِعُوا إِلَىٰ أَبِيكُمْ فَقُولُوا يَا أَبَانَا إِنَّ ابْنَكَ سَرَقَ وَمَا شَهِدْنَا إِلَّا بِمَا عَلِمْنَا وَمَا كُنَّا لِلْغَيْبِ حَافِظِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তোমরা তোমাদের পিতার কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বল, আব্বাজী! আপনার পুত্র চুরি করেছিল আর আমরা সে কথাই বললাম, যা আমরা জানতে পেরেছি। গায়েবের খবর রাখা তো আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তোমরা তোমাদের পিতার কাছে ফিরে যাও এবং বলঃ পিতা আপনার ছেলে চুরি করেছে। আমরা তাই বলে দিলাম, যা আমাদের জানা ছিল এবং অদৃশ্য বিষয়ের প্রতি আমাদের লক্ষ্য ছিল না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘তোমরা তোমাদের পিতার নিকট ফিরে যাও এবং বল, ‘হে আমাদের পিতা! আপনার পুত্র তো চুরি করেছে এবং আমরা যা জানি তারই প্রত্যক্ষ বিবরণ দিলাম। আর অজানা ব্যাপারে আমরা সংরক্ষণকারী নই।


৮২


وَاسْأَلِ الْقَرْيَةَ الَّتِي كُنَّا فِيهَا وَالْعِيرَ الَّتِي أَقْبَلْنَا فِيهَا ۖ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আমরা যে জনপদে ছিলাম তাকে জিজ্ঞেস করুন এবং আমরা যে যাত্রী দলের সাথে এসেছি তাদের থেকে যাচাই করে নিন। নিশ্চয়ই আমরা সত্যবাদী।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

জিজ্ঞেস করুন ঐ জনপদের লোকদেরকে যেখানে আমরা ছিলাম এবং ঐ কাফেলাকে, যাদের সাথে আমরা এসেছি। নিশ্চিতই আমরা সত্য বলছি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘যে জনপদে আমরা ছিলাম এর অধিবাসীগণ কে জিজ্ঞাসা করুন এবং যে যাত্রীদলের সঙ্গে আমরা এসেছি তাদেরকেও। আমরা অবশ্যই সত্য বলছি।’


৮৩


قَالَ بَلْ سَوَّلَتْ لَكُمْ أَنفُسُكُمْ أَمْرًا ۖ فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ۖ عَسَى اللَّهُ أَن يَأْتِيَنِي بِهِمْ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(সুতরাং ভাইয়েরা ইয়াকুব আলাইহিস সালামের কাছে গেল এবং বড় ভাই যা শিখিয়ে দিয়েছিল সে কথাই তাকে বলল)। ইয়াকুব (তা শুনে) বলল, না, বরং তোমাদের মন নিজের তরফ থেকে একটি কথা বানিয়ে নিয়েছে। ৫৫ সুতরাং আমার পক্ষে সবরই শ্রেয়। কিছু অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তাদের সকলকে আমার কাছে এনে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি বললেনঃ কিছুই না, তোমরা মনগড়া একটি কথা নিয়েই এসেছ। এখন ধৈর্য্যধারণই উত্তম। সম্ভবতঃ আল্লাহ তাদের সবাইকে একসঙ্গে আমার কাছে নিয়ে আসবেন তিনি সুবিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ইয়া‘ক‚ব বলল, ‘না, তোমাদের মন তোমাদের জন্যে একটি কাহিনী সাজিয়ে দিয়েছে, সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়; হয়তো আল্লাহ্ এদেরকে একসঙ্গে আমার নিকট এনে দিবেন। অবশ্য তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’


তাফসীরঃ

৫৫. হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিশ্চিত ছিলেন বিনইয়ামীন চুরি করতে পারে না। তাই তিনি মনে করলেন, এবারও তারা কোনও গল্প বানিয়ে নিয়েছে।


৮৪


وَتَوَلَّىٰ عَنْهُمْ وَقَالَ يَا أَسَفَىٰ عَلَىٰ يُوسُفَ وَابْيَضَّتْ عَيْنَاهُ مِنَ الْحُزْنِ فَهُوَ كَظِيمٌ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এবং (একথা বলে) সে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলতে লাগল, আহা ইউসুফ! আর তার চোখ দু’টি দুঃখে (কাঁদতে কাঁদতে) সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তার হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং তাদের দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেনঃ হায় আফসোস ইউসুফের জন্যে। এবং দুঃখে তাঁর চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গেল। এবং অসহনীয় মনস্তাপে তিনি ছিলেন ক্লিষ্ট।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে এদের হতে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, ‘আফসোস ইউসুফের জন্যে।’ শোকে তার চোখদ্বয় সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট।


৮৫


قَالُوا تَاللَّهِ تَفْتَأُ تَذْكُرُ يُوسُفَ حَتَّىٰ تَكُونَ حَرَضًا أَوْ تَكُونَ مِنَ الْهَالِكِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তার পুত্রগণ বলতে লাগল, আল্লাহর কসম! আপনি তো ইউসুফকে ভুলবেন না, যতক্ষণ না আপনি সম্পূর্ণ জরাজীর্ণ হবেন কিংবা মারাই যাবেন।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বলতে লাগলঃ আল্লাহর কসম আপনি তো ইউসুফের স্মরণ থেকে নিবৃত হবেন না, যে পর্যন্ত মরণপন্ন না হয়ে যান কিংবা মৃতবরণ না করেন


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘আল্লাহ্ র শপথ! আপনি তো ইউসুফের কথা সদা স্মরণ করতে থাকবেন যতক্ষণ না আপনি মুমূর্ষু হবেন, বা মৃত্যুবরণ করবেন।’


৮৬


قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইয়াকুব বলল, আমি আমার দুঃখ ও বেদনার অভিযোগ (তোমাদের কাছে নয়) কেবল আল্লাহরই কাছে করছি। আর আল্লাহ সম্পর্কে আমি যতটা জানি, তোমরা জান না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি বললেনঃ আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সমীপেই নিবেদন করছি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যা জানি, তা তোমরা জান না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘আমি আমার অসহনীয় বেদনা, আমার দুঃখ শুধু আল্লাহ্ র নিকট নিবেদন করছি এবং আমি আল্লাহ্ র নিকট হতে জানি যা তোমরা জান না।


৮৭


يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ওহে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সন্ধান চালাও। তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, জেনে রেখ আল্লাহর রহমত থেকে কেবল তারাই নিরাশ হয়, যারা কাফের। ৫৬


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বৎসগণ! যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে তালাশ কর এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায়, ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘হে আমার পুত্রগণ! তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার সহোদরের অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহ্ র আশিস হতে তোমরা নিরাশ হয়ো না। কারণ আল্লাহ্ র আশিস্ হতে কেউই নিরাশ হয় না, কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত।’


তাফসীরঃ

৫৬. হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম নিশ্চিত ছিলেন যে, ইউসুফ আলাইহিস সালামও কোথাও না কোথাও জীবিত আছেন। আর বিনইয়ামীন তো আটক রয়েছে। তাই তিনি কিছু দিন পর পূর্ণ আস্থার সাথে হুকুম দিলেন, ‘তোমরা গিয়ে তাদের দু’জনকে খোঁজ কর। ইত্যবসরে তাদের আনা খাদ্যও ফুরিয়ে গিয়েছিল। আর দুর্ভিক্ষ তো চলছিলই। সুতরাং ভাইয়েরা পুনরায় মিসর যেতে মনস্থ করল। কেননা বিনইয়ামীন তো নিশ্চিতভাবেই সেখানে আছে। প্রথমে তাকে মুক্ত করে আনার চেষ্টা করা চাই। তারপর ইউসুফ আলাইহিস সালামেরও খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করা যাবে। কাজেই তারা মিসর গেল এবং প্রথমে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে রসদের ব্যাপারে কথা বলল, যাতে তার মনটা কিছুটা নরম হয় এবং বিনইয়ামীনকে ফেরত নেওয়া সম্পর্কে কথা বলা সহজ হয়। পরবর্তী আয়াতসমূহে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সাথে তাদের সেই কথোপকথনের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।


৮৮


فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَيْهِ قَالُوا يَا أَيُّهَا الْعَزِيزُ مَسَّنَا وَأَهْلَنَا الضُّرُّ وَجِئْنَا بِبِضَاعَةٍ مُّزْجَاةٍ فَأَوْفِ لَنَا الْكَيْلَ وَتَصَدَّقْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّ اللَّهَ يَجْزِي الْمُتَصَدِّقِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সুতরাং তারা যখন ইউসুফের কাছে পৌঁছল, তখন তারা (ইউসুফকে) বলল, হে আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবারবর্গ কঠিন মুসিবতে আক্রান্ত হয়েছি। আমরা সামান্য কিছু পুঁজি নিয়ে এসেছি। আপনি আমাদেরকে পরিপূর্ণ রসদ দান করুন ৫৭ এবং আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্যে অনুগ্রহকারীদেরকে মহা পুরস্কার দিয়ে থাকেন।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে পৌঁছল তখন বললঃ হে আযীয, আমরা ও আমাদের পরিবারবর্গ কষ্টের সম্মুখীন হয়ে পড়েছি এবং আমরা অপর্যাপ্ত পুঁজি নিয়ে এসেছি। অতএব আপনি আমাদের পুরোপুরি বরাদ্দ দিন এবং আমাদের কে দান করুন। আল্লাহ দাতাদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকেন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যখন এরা তার নিকট উপস্থিত হল তখন বলল, ‘হে ‘আযীয! আমরা ও আমাদের পরিবার-পরিজন বিপন্ন হয়ে পড়েছি এবং আমরা তুচ্ছ পুঁজি নিয়ে এসেছি; আপনি আমাদের রসদ পূর্ণমাত্রায় দিন এবং আমাদেরকে দান করুন; আল্লাহ্ অবশ্যই দাতাগণকে পুরস্কৃত করে থাকেন।’


তাফসীরঃ

৫৭. অর্থাৎ, দুর্ভিক্ষের কারণে আমরা কঠিন দুর্দশার শিকার হয়েছি, যে কারণে আমাদের প্রয়োজনীয় রসদ কেনার জন্য যে মূল্য দরকার এবার আমরা তাও আনতে পারিনি। সুতরাং এবার আপনি আমাদেরকে যা-কিছু দেবেন তা কেবল আপনার অনুগ্রহই হবে। কুরআন মাজীদে ‘সদাকা’ تَصَدَّق শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। সদাকা বলে এমন দানকে যা দেওয়া দাতার পক্ষে অবশ্যকর্তব্য নয়। তথাপি সে তা কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে অনুগ্রহস্বরূপ দিয়ে থাকে।


৮৯


قَالَ هَلْ عَلِمْتُم مَّا فَعَلْتُم بِيُوسُفَ وَأَخِيهِ إِذْ أَنتُمْ جَاهِلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ বলল, তোমাদের কি খবর আছে তোমরা যখন অজ্ঞতার শিকার ছিলে তখন ইউসুফ ও তার ভায়ের সাথে কী আচরণ করেছিলে?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইউসুফ বললেনঃ তোমাদের জানা আছে কি, যা তোমরা ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সাথে করেছ, যখন তোমরা অপরিণামদর্শী ছিলে?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘তোমরা কি জান, তোমরা ইউসুফ ও তার সহোদরের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা ছিলে অজ্ঞ ?’


৯০


قَالُوا أَإِنَّكَ لَأَنتَ يُوسُفُ ۖ قَالَ أَنَا يُوسُفُ وَهَـٰذَا أَخِي ۖ قَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْنَا ۖ إِنَّهُ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(একথা শুনে) তারা বলে উঠল, তবে কি তুমিই ইউসুফ? ৫৮ ইউসুফ বলল, আমি ইউসুফ এবং এই আমার ভাই। আল্লাহ আমাদের প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন ও ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ সেরূপ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বলল, তবে কি তুমিই ইউসুফ! বললেনঃ আমিই ইউসুফ এবং এ হল আমার সহোদর ভাই। আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয় যে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, আল্লাহ এহেন সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘তবে কি তুমিই ইউসুফ?’ সে বলল, ‘আমিই ইউসুফ এবং এই আমার সহোদর; আল্লাহ্ তো আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি মুত্তাকী এবং ধৈর্যশীল, আল্লাহ্ তো সেরূপ সৎকর্মপরায়ণদের শ্রমফল নষ্ট করেন না।’


তাফসীরঃ

৫৮. এ পর্যন্ত তো তারা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে চিনতে পারছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই যখন নিজের নাম উচ্চারণ করলেন, তখন তারা ভালো করে লক্ষ্য করল ফলে তাদের ধারণা জন্মাল হয়ত তিনিই ইউসুফ।


৯১


قَالُوا تَاللَّهِ لَقَدْ آثَرَكَ اللَّهُ عَلَيْنَا وَإِن كُنَّا لَخَاطِئِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাদের উপর তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং আমরা নিশ্চয়ই অপরাধী ছিলাম।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ আল্লাহর কসম, আমাদের চাইতে আল্লাহ তোমাকে পছন্দ করেছেন এবং আমরা অবশ্যই অপরাধী ছিলাম।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, আল্লাহ্ র শপথ! আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তোমাকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং আমরা তো অপরাধী ছিলাম।’


৯২


قَالَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ ۖ يَغْفِرُ اللَّهُ لَكُمْ ۖ وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইউসুফ বলল, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আনা হবে না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সকল দয়ালু অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দয়ালু।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বললেন, আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের কে ক্ষমা করুন। তিনি সব মেহেরবানদের চাইতে অধিক মেহেরবান।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’


৯৩


اذْهَبُوا بِقَمِيصِي هَـٰذَا فَأَلْقُوهُ عَلَىٰ وَجْهِ أَبِي يَأْتِ بَصِيرًا وَأْتُونِي بِأَهْلِكُمْ أَجْمَعِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আমার এই জামা নিয়ে যাও এবং এটা আমার পিতার চেহারার উপর রেখে দিও। এর ফলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে। আর তোমাদের পরিবারের সকলকে আমার কাছে নিয়ে এসো। ৫৯


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তোমরা আমার এ জামাটি নিয়ে যাও। এটি আমার পিতার মুখমন্ডলের উপর রেখে দিও, এতে তাঁর দৃষ্টি শক্তি ফিরে আসবে। আর তোমাদের পরিবারবর্গের সবাইকে আমার কাছে নিয়ে এস।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তোমরা আমার এই জামাটি নিয়ে যাও এবং এটা আমার পিতার মুখমণ্ডলের ওপর রেখ; তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন। আর তোমাদের পরিবারের সকলকেই আমার নিকট নিয়ে এসো।’


তাফসীরঃ

৫৯. এস্থলে প্রশ্ন জাগে, ইউসুফ আলাইহিস সালাম নিশ্চয়ই জানতেন, তাঁর বিচ্ছেদে তাঁর মহান পিতার কী অবস্থা হতে পারে। তা সত্ত্বেও এত দীর্ঘকাল যাবৎ তিনি এমন নিরুদ্দেশের মত কাটিয়ে দিলেন যে, কোনও সূত্রেই পিতার কাছে নিজ সহীহ-সালামতে থাকার খবর পর্যন্ত পাঠানোর চেষ্টা করলেন না। অথচ তাঁর পক্ষে এটা কোনও কঠিন কাজ ছিল না। প্রথমে তিনি ছিলেন আযীযের ঘরে। তখন খবর পাঠানোর জন্য কোনও না কোনও উপায় তাঁর পেয়ে যাওয়ার কথা। মাঝখানে কয়েক বছর কারাবাসে থাকেন। মুক্তি লাভের পর তো মিসরের সর্বময় কর্তৃত্বই তাঁর হাতে এসে গিয়েছিল। তখন প্রথমেই তিনি হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামসহ পরিবারের সকলকে মিসরে ডেকে আনার ব্যবস্থা করতে পারতেন এবং এতদিনে ভাইদেরকে যে কথা বললেন, তা তাদের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতকালেই বলতে পারতেন। এর ফলে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দুঃখ-বেদনার কাল সংক্ষেপ হতে পারত। কিন্তু তিনি এসবের কিছুই করলেন না। তা কেন করলেন না? এর সোজা-সাপটা জবাব এই যে, এসব ঘটনার ভেতর আল্লাহ তাআলার অনেক বড়-বড় হিকমত ও রহস্য নিহিত ছিল। বিশেষত তিনি চাচ্ছিলেন তাঁর প্রিয় বান্দা ও রাসূল হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সবর ও সংযমের পরীক্ষা নিতে। তাই এ সুদীর্ঘ কালে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে পিতার সাথে কোনও রকম যোগাযোগের অনুমতিই দেওয়া হয়নি।


৯৪


وَلَمَّا فَصَلَتِ الْعِيرُ قَالَ أَبُوهُمْ إِنِّي لَأَجِدُ رِيحَ يُوسُفَ ۖ لَوْلَا أَن تُفَنِّدُونِ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

যখন এ যাত্রীদল (মিসর থেকে কিনআনের দিকে) রওয়ানা হল, তখন (কিনআনে) তাদের পিতা (আশেপাশের লোকদেরকে) বলল, তোমরা যদি আমাকে না বল যে, বুড়ো অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছে, তবে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি। ৬০


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যখন কাফেলা রওয়ানা হল, তখন তাদের পিতা বললেনঃ যদি তোমরা আমাকে অপ্রকৃতিস্থ না বল, তবে বলিঃ আমি নিশ্চিতরূপেই ইউসুফের গন্ধ পাচ্ছি।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর যাত্রীদল যখন বের হয়ে পড়ল তখন এদের পিতা বলল, ‘তোমরা যদি আমাকে অপ্রকৃতিস্থ মনে না কর তবে বলি, আমি ইউসুফের ঘ্রাণ পাচ্ছি।’


তাফসীরঃ

৬০. হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম তাঁর ভাইদেরকে বলে দিয়েছিলেন, তারা যেন পরিবারের সকলকে মিসরে নিয়ে আসে। সুতরাং তারা মিসর থেকে একটি যাত্রীদল আকারে রওয়ানা হল। এদিকে তো তারা মিসর থেকে রওয়ানা হল, ওদিকে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘ্রাণ পেতে লাগলেন। এটা ছিল উভয় নবীর মুজিযা এবং হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের জন্য এই সুসংবাদ যে, তার পরীক্ষার কাল আশু সমাপ্তির পথে। এস্থলে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম যখন কিনআনে খুব কাছেই কুয়ার ভেতর ছিলেন, তখন তো হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম তাঁর কোন সুবাস পাননি, তাছাড়া তাঁর মিসর অবস্থানকালীন সময়েও ইতঃপূর্বে এ জাতীয় কোনও অনুভূতির কথা প্রকাশ করেননি। এর দ্বারা বোঝা গেল, মুজিযা কোন নবীর নিজের এখতিয়ারাধীন বিষয় নয়। আল্লাহ তাআলাই যখন চান তা প্রকাশ করেন।


৯৫


قَالُوا تَاللَّهِ إِنَّكَ لَفِي ضَلَالِكَ الْقَدِيمِ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা (উপস্থিত লোকজন) বলল, আল্লাহর কসম! আপনি এখনও পর্যন্ত আপনার পুরানো ভুল ধারণার মধ্যেই আছেন। ৬১


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

লোকেরা বললঃ আল্লাহর কসম, আপনি তো সেই পুরানো ভ্রান্তিতেই পড়ে আছেন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তারা বলল, ‘আল্লাহ্ র শপথ! আপনি তো আপনার পূর্ব-বিভ্রান্তিতেই রয়েছেন


তাফসীরঃ

৬১. অর্থাৎ, এই ভুল ধারণা যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এখনও জীবিত আছেন এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হবে।


৯৬


فَلَمَّا أَن جَاءَ الْبَشِيرُ أَلْقَاهُ عَلَىٰ وَجْهِهِ فَارْتَدَّ بَصِيرًا ۖ قَالَ أَلَمْ أَقُل لَّكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারপর যখন সুসংবাদবাহী এসে সে (ইউসুফের) জামা তার চেহারার উপর ফেলে দিল, অমনি তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসল। ৬২ সে (তার পুত্রদেরকে) বলল, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি, আল্লাহ সম্পর্কে আমি যতটা জানি তোমরা জান না?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর যখন সুসংবাদদাতা পৌঁছল, সে জামাটি তাঁর মুখে রাখল। অমনি তিনি দৃষ্টি শক্তি ফিরে পেলেন। বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা জানি তোমরা তা জান না?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর যখন সুসংবাদবাহক উপস্থিত হল এবং তার মুখমণ্ডলের ওপর জামাটি রাখলো তখন সে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেল। সে বলল, ‘আমি কি তোমাদেরকে বলি নাই যে, আমি আল্লাহ্ র নিকট হতে জানি যা তোমরা জান না?’


তাফসীরঃ

৬২. ‘সুসংবাদদাতা’ ছিল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সর্বাপেক্ষা বড় ভাই। তার নাম কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে ‘ইয়াহূদা’ এবং কোন বর্ণনায় ‘রূবেল’। ‘সুসংবাদ দান’ দ্বারা এই বার্তা বোঝানো হয়েছে যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম এখনও জীবিত আছেন এবং তিনি সকলকে মিসরে তাঁর কাছে যেতে বলেছেন। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামা চেহারায় রাখা মাত্র হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসাটাও একটা মুজিযা ছিল। মুফাসসিরগণ বলেন, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জামার সাথে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জড়িত আছে, যথা ভাইয়েরা তার জামায় রক্ত মাখিয়ে পিতার কাছে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু জামাটি অক্ষত দেখে হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম বুঝে ফেলেছিলেন যে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে কোন বাঘ-টাগে খায়নি। আবার যুলায়খা তাঁর জামা পেছন দিক থেকে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছিল এবং তা দ্বারা প্রমাণ হয়েছিল তিনি নির্দোষ। তাঁর জামারই সুবাস হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম সুদূর কিনআন থেকে অনুভব করেছিলেন। সবশেষে এই জামারই স্পর্শে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসল।


৯৭


قَالُوا يَا أَبَانَا اسْتَغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا إِنَّا كُنَّا خَاطِئِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারা বলল, আব্বাজী! আপনি আমাদের পাপরাশির ক্ষমার জন্য দু‘আ করুন। আমরা নিশ্চয়ই গুরুতর অপরাধী ছিলাম।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা বললঃ পিতা আমাদের অপরাধ ক্ষমা করান। নিশ্চয় আমরা অপরাধী ছিলাম।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করুন; আমরা তো অপরাধী।’


৯৮


قَالَ سَوْفَ أَسْتَغْفِرُ لَكُمْ رَبِّي ۖ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

ইয়াকুব বলল, আমি সত্ত্বর আমার প্রতিপালকের কাছে তোমাদের ক্ষমার জন্য দু‘আ করব। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বললেন, সত্বরই আমি পালনকর্তার কাছে তোমাদের জন্য ক্ষমা চাইব। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালূ।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

সে বলল, ‘আমি আমার প্রতিপালকের নিকট তোমাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করব। তিনি তো অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

আরো পড়ুন :-

স্মরণ শক্তি বৃদ্ধির দোয়া,মেধা বৃদ্ধির দোয়া,স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর দোয়া!নামাজের পর ২১ বাড় পড়ুন

দোয়াটি পড়লে সাথে সাথে রাগ কমে যায়, রাগ কমানোর দোয়া,শিশুদের রাগ কমানোর আমল

(ads2)

(getButton) #text=(আল কোরআন বাংলা অনুবাদ ) #file=(Al Quran Bangla) #icon=(download) #size=(25) #color=(#d10404) #info=(PDF Download)


৯৯


فَلَمَّا دَخَلُوا عَلَىٰ يُوسُفَ آوَىٰ إِلَيْهِ أَبَوَيْهِ وَقَالَ ادْخُلُوا مِصْرَ إِن شَاءَ اللَّهُ آمِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তারপর তারা সকলে যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হল, সে তার পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিল ৬৩ এবং সকলকে বলল, আপনারা সকলে মিসরে প্রবেশ করুন ইনশাআল্লাহ আপনারা এখানে স্বস্তিতে থাকবেন।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অতঃপর যখন তারা ইউসুফের কাছে পৌঁছল, তখন ইউসুফ পিতা-মাতাকে নিজের কাছে জায়গা দিলেন এবং বললেনঃ আল্লাহ চাহেন তো শান্তি চিত্তে মিসরে প্রবেশ করুন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এরপর এরা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হল, তখন সে তার পিতা-মাতাকে আলিংগন করল এবং বলল, ‘আপনারা আল্লাহ্ র ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।’


তাফসীরঃ

৬৩. পিতা-মাতা, ভ্রাতৃবর্গ ও পরিবারের অন্যান্যদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম শহরের বাইরে চলে এসেছিলেন। যখন পিতা-মাতার সঙ্গে সাক্ষাত হল তাদেরকে অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে নিজের কাছে বসালেন। প্রাথমিক কথাবার্তার পর আগন্তুকদের সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, এবার সকলে নিশ্চিন্তে, নিরাপদ নগরের দিকে চলুন। এ সময় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের গর্ভধারিণী মা জীবিত ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে দু’ রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। জীবিত থেকে থাকলে পিতা-মাতা দ্বারা আপন পিতা-মাতাই বোঝানো হয়েছে। আর যদি তার আগেই মৃত্যু হয়ে থাকে, তবে সৎ মা’কেও যেহেতু মায়ের মতই গণ্য করা হয়ে থাকে, তাই তাকেসহ একত্রে পিতা-মাতা বলা হয়েছে।


১০০


وَرَفَعَ أَبَوَيْهِ عَلَى الْعَرْشِ وَخَرُّوا لَهُ سُجَّدًا ۖ وَقَالَ يَا أَبَتِ هَـٰذَا تَأْوِيلُ رُؤْيَايَ مِن قَبْلُ قَدْ جَعَلَهَا رَبِّي حَقًّا ۖ وَقَدْ أَحْسَنَ بِي إِذْ أَخْرَجَنِي مِنَ السِّجْنِ وَجَاءَ بِكُم مِّنَ الْبَدْوِ مِن بَعْدِ أَن نَّزَغَ الشَّيْطَانُ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَتِي ۚ إِنَّ رَبِّي لَطِيفٌ لِّمَا يَشَاءُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

সে তার পিতা-মাতাকে সিংহাসনে বসাল আর তারা সকলে তার সামনে সিজদায় পড়ে গেল। ৬৪ ইউসুফ বলল, আব্বাজী! এই হল আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা আমার প্রতিপালক সত্যে পরিণত করেছেন। ৬৫ তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহ করেছেন যে, আমাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়েছেন এবং আপনাদেরকে দেহাত থেকে এখানে নিয়ে এসেছেন। অথচ ইতঃপূর্বে আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে শয়তান অনর্থ সৃষ্টি করেছিল। ৬৬ বস্তুত আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা করেন, তার জন্য অতি সূক্ষ্ম ব্যবস্থা করেন। নিশ্চয়ই তিনিই সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং তিনি পিতা-মাতাকে সিংহাসনের উপর বসালেন এবং তারা সবাই তাঁর সামনে সেজদাবনত হল। তিনি বললেনঃ পিতা এ হচ্ছে আমার ইতিপূর্বেকার স্বপ্নের বর্ণনা আমার পালনকর্তা একে সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমাকে জেল থেকে বের করেছেন এবং আপনাদেরকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছেন, শয়তান আমার ও আমার ভাইদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করে দেয়ার পর। আমার পালনকর্তা যা চান, কৌশলে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয় তিনি বিজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এবং ইউসুফ তার মাতা-পিতাকে উচ্চাসনে বসাল এবং এরা সকলে তার সম্মানে সিজ্দায় লুটিয়ে পড়ল। সে বলল, ‘হে আমার পিতা! এটাই আমার পূর্বেকার স্বপ্নের ব্যাখ্যা; আমার প্রতিপালক তা সত্যে পরিণত করেছেন এবং তিনি আমাকে কারাগার হতে মুক্ত করে এবং শয়তান আমার ও আমার ভাইদের সম্পর্ক নষ্ট করার পরও আপনাদেরকে মরু অঞ্চল হতে এখানে এনে দিয়ে আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আমার প্রতিপালক যা ইচ্ছা তা নিপুণতার সঙ্গে করেন। তিনি তো সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’


তাফসীরঃ

৬৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে এ আয়াতের যে তাফসীর বর্ণিত আছে, সে অনুযায়ী হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে তাঁরা সিজদা করেছিল আল্লাহর তাআলার শোকর আদায়ের লক্ষ্যে। অর্থাৎ, তারা সিজদা করেছিল আল্লাহ তাআলাকেই। হ্যাঁ, তা করেছিল হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের সামনে, তাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে। ইমাম রাযী (রহ.) এ তাফসীরকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেন, এটা ইবাদতমূলক সিজদা ছিল না; বরং শ্রদ্ধাজ্ঞাপনমূলক সিজদা, যেমন ফেরেশতাগণ হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করেছিল। এরূপ সিজদা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের শরীয়তে জায়েয ছিল। কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়তে এরূপ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনমূলক সিজদাও জায়েয নয়।


৬৫. অর্থাৎ, স্বপ্নে দেখা চন্দ্র ও সূর্য দ্বারা বোঝানো হয়েছিল পিতা-মাতাকে আর নক্ষত্রসমূহ দ্বারা এগার ভাইকে।


৬৬. সুদীর্ঘ বিরহের কালে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যে সকল বিপদ-আপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যদি অন্য কেউ সে রকম বিপদে পড়ত, তবে পিতা-মাতার সাথে সাক্ষাতের পর সর্বপ্রথম নিজের সেই দুঃখণ্ডদুর্দশার কাহিনীই শোনাত। কিন্তু হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে দেখুন সেসব মুসিবত সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারণ করছেন না। ঘটনাবলী উল্লেখ করছেন তো কেবল তার ভালো-ভালো দিকই করছেন আর সে জন্য আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করছেন। কারাবাস করেছেন, কিন্তু তার উল্লেখ না করে উল্লেখ করছেন কারাগার থেকে মুক্তিলাভের কথা। পিতা-মাতা হতে কতকাল বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়েছে, কিন্তু সে কথার দিকে না গিয়ে তাদের মিসর আগমনের কথা ব্যক্ত করছেন এবং সেজন্য আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করছেন। ভাইয়েরা তার উপর যে জুলুম করেছিল, সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে নালিশ না জানিয়ে, বরং সেটাকে শয়তানের সৃষ্ট ফাসাদ সাব্যস্ত করে কথা শেষ করে দিচ্ছেন। এর দ্বারা বড় মূল্যবান শিক্ষা লাভ হয়। আর তা এই যে, প্রতিটি মানুষের উচিত সে যত কঠিন পরিস্থিতিরই সম্মুখীন হোক, সর্বদা ঘটনার ইতিবাচক দিকের প্রতি নজর রাখবে এবং সেজন্য আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করবে।


১০১


۞ رَبِّ قَدْ آتَيْتَنِي مِنَ الْمُلْكِ وَعَلَّمْتَنِي مِن تَأْوِيلِ الْأَحَادِيثِ ۚ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজত্বেও অংশ দিয়েছ এবং দান করেছ স্বপ্ন-ব্যাখ্যার জ্ঞান। হে আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর স্রষ্টা! দুনিয়া ও আখেরাতে তুমিই আমার অভিভাবক। তুমি দুনিয়া থেকে আমাকে এমন অবস্থায় তুলে নিও, যখন আমি থাকি তোমার অনুগত। আর আমাকে পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করো।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হে পালনকর্তা আপনি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতাও দান করেছেন এবং আমাকে বিভিন্ন তাৎপর্য সহ ব্যাখ্যা করার বিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছেন। হে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডলের স্রষ্টা, আপনিই আমার কার্যনির্বাহী ইহকাল ও পরকালে। আমাকে ইসলামের উপর মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে স্বজনদের সাথে মিলিত করুন।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে রাজ্য দান করেছ এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিয়েছ। হে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! তুমিই ইহলোক ও পরলোকে আমার অভিভাবক। তুমি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দাও এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর।’


১০২


ذَٰلِكَ مِنْ أَنبَاءِ الْغَيْبِ نُوحِيهِ إِلَيْكَ ۖ وَمَا كُنتَ لَدَيْهِمْ إِذْ أَجْمَعُوا أَمْرَهُمْ وَهُمْ يَمْكُرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(হে নবী!) এসব ঘটনা গায়েবের সংবাদরাজির একটা অংশ, যা ওহীর মাধ্যমে আমি তোমাকে জানাচ্ছি। ৬৭ তুমি সেই সময় তাদের (অর্থাৎ ইউসুফের ভাইদের) কাছে উপস্থিত ছিলে না, যখন তারা ষড়যন্ত্র করে নিজেদের সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেলেছিল (যে, তারা ইউসুফকে কুয়ায় ফেলে দেবে)।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এগুলো অদৃশ্যের খবর, আমি আপনার কাছে প্রেরণ করি। আপনি তাদের কাছে ছিলেন না, যখন তারা স্বীয় কাজ সাব্যস্ত করছিল এবং চক্রান্ত করছিল।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এটা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যা তোমাকে আমি ওহী দিয়ে অবহিত করছি; ষড়যন্ত্রকালে যখন এরা মতৈক্যে পৌঁছিয়াছিল, তখন তুমি এদের সঙ্গে ছিলে না।


তাফসীরঃ

৬৭. সূরার শুরুতে বলা হয়েছিল যে, আল্লাহ তাআলা হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা সম্বলিত এ সূরা নাযিল করেছিলেন কাফেরদের একটা প্রশ্নের উত্তরে। তারা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছিল, বনী ইসরাঈল মিসরে এসে বসবাস করেছিল কী কারণে? তারা নিশ্চিত ছিল, বনী ইসরাঈলের ইতিহাসের এ অধ্যায় সম্পর্কে তাঁর কিছু জানা নেই। এমন কোনও মাধ্যমও নেই, যা দ্বারা এ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব। তাই তাদের ধারণা ছিল, তিনি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে ব্যর্থ হতে দিলেন না। তিনি সে ঘটনা বর্ণনার জন্য এই পূর্ণ সূরাটিই নাযিল করে দিলেন। সূরার শেষে এখন ফলাফল বের করা হচ্ছে যে, যেহেতু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এ ঘটনা জানার মত কোন মাধ্যম ছিল না, তাই এর দাবী ছিল যারা তাকে এ প্রশ্নটি করেছিল, তারা তাঁর মুখে ঘটনার এরূপ বিশদ বিবরণ শোনার পর তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের উপর অবশ্যই ঈমান আনবে। কিন্তু সত্য উদ্ভাসিত হওয়ার পর তা গ্রহণ করে নেওয়া যেহেতু তাদের উদ্দেশ্য ছিল না; বরং এসব প্রশ্ন কেবলই হঠকারিতা ও জেদের বশবর্তীতেই তারা করত, তাই সামনের আয়াতসমূহে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এসব সুস্পষ্ট নিদর্শন চোখে দেখা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশেই ঈমান আনবে না।


১০৩


وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

এতদসত্ত্বেও অধিকাংশ লোক ঈমান আনার নয়, তাতে তোমার অন্তর যতই কামনা করুক না কেন।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আপনি যতই চান, অধিকাংশ লোক বিশ্বাসকারী নয়।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তুমি যতই চাও না কেন, অধিকাংশ লোকই বিশ্বাস করার নয়।


১০৪


وَمَا تَسْأَلُهُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ ۚ إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

অথচ এর বিনিময়ে (অর্থাৎ প্রচার কার্যের বিনিময়ে) তুমি তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাও না। এটা তো নিখিল বিশ্বের সকলের জন্য এক উপদেশ-বার্তা।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আপনি এর জন্যে তাদের কাছে কোন বিনিময় চান না। এটা তো সারা বিশ্বের জন্যে উপদেশ বৈ নয়।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এবং তুমি তাদের নিকট এটার জন্যে কোন পারিশ্রমিক দাবি করছো না। এটা তো বিশ্বজগতের জন্যে উপদেশ ব্যতীত কিছু নয়।


১০৫


وَكَأَيِّن مِّنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কত নিদর্শন রয়েছে, যার উপর দিয়ে তাদের বিচরণ হয়, কিন্তু তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অনেক নিদর্শন রয়েছে নভোমন্ডলে ও ভু-মন্ডলে যেগুলোর উপর দিয়ে তারা পথ অতিক্রম করে এবং তারা এসবের দিকে মনোনিবেশ করে না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অনেক নিদর্শন রয়েছে; তারা এই সমস্ত প্রত্যক্ষ করে, কিন্তু তারা এই সকলের প্রতি উদাসীন।


১০৬


وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُم بِاللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشْرِكُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকই এমন যে, তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখলেও তা এভাবে যে, তাঁর সঙ্গে শরীক করে। ৬৮


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তাদের অধিকাংশ আল্লাহে বিশ্বাস করে, কিন্তু তাঁর শরীক করে।


তাফসীরঃ

৬৮. অর্থাৎ মুখে তো সকলেই বলে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টিকর্তা ও সকলের মালিক, তা সত্ত্বেও কেউ প্রতিমা পূজা করে, কেউ বলে তাঁর পুত্র বা কন্যা আছে, কেউ তাকে আত্মা ও দেহধারী সত্তা বলে, কেউ সাধু-যাজকদেরকে ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী মনে করে, তাজিয়া, কবর ইত্যাদির পূজা করে এমন লোকও কম নয়, আরও আছে পীর পূজা ও বুদ্ধির পূজা। এভাবে বিচিত্র সব দেবতা ও তার পূজা-অর্চনা দ্বারা মানুষ খালেস তাওহীদি আকীদাকে কলঙ্কিত করছে। এমন লোক কমই পাওয়া যায়, যারা বিশ্বাস বা কর্মগত এবং স্থূল বা সূক্ষ্ম শিরকে লিপ্ত হয়ে নিজ তাওহীদী বিশ্বাসকে দূষিত করছে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সব রকম শিরক থেকে হেফাজত করুন। -অনুবাদক (তাফসীরে উছমানী থেকে)


১০৭


أَفَأَمِنُوا أَن تَأْتِيَهُمْ غَاشِيَةٌ مِّنْ عَذَابِ اللَّهِ أَوْ تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

তবে কি তারা এ বিষয়ের একটুও ভয় রাখে না যে, তাদের উপর আল্লাহর আযাবের কোন মুসিবত এসে পড়বে অথবা সহসা তাদের উপর তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামত আপতিত হবে?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তারা কি নির্ভীক হয়ে গেছে এ বিষয়ে যে, আল্লাহর আযাবের কোন বিপদ তাদেরকে আবৃত করে ফেলবে অথবা তাদের কাছে হঠাৎ কেয়ামত এসে যাবে, অথচ তারা টেরও পাবে না?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তবে কি তারা আল্লাহ্ র সর্বগ্রাসী শাস্তি হতে বা তাদের অজ্ঞাতসারে কিয়ামতের আকস্মিক উপস্থিতি হতে নিরাপদ?


১০৮


قُلْ هَـٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ ۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي ۖ وَسُبْحَانَ اللَّهِ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(হে নবী!) বলে দাও, এই আমার পথ, ৬৯ আমি পরিপূর্ণ উপলব্ধির সাথে আল্লাহর দিকে ডাকি এবং যারা আমার অনুসরণ করে তারাও। আল্লাহ (সব রকম) শিরক থেকে পবিত্র। যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করে, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

বলে দিনঃ এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই আমি এবং আমার অনুসারীরা। আল্লাহ পবিত্র। আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

বল, ‘এটাই আমার পথ : আল্লাহ্ র প্রতি মানুষকে আমি আহ্বান করি সজ্ঞানে-আমি এবং আমার অনুসারিগণও। আল্লাহ্ মহিমান্বিত এবং যারা আল্লাহ্ র শরীক করে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত নই।’


তাফসীরঃ

৬৯. অর্থাৎ, এই খালেস তাওহীদের পথই আমার পথ, যাতে কোন অস্পষ্টতা ও বক্রতা নেই। আমি সারা বিশ্বকে ডেকে বলছি, সব ধারণা-কল্পনা ও অংশীবাদিতা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর দিকে এসো এবং তার তাওহীদকে আঁকড়ে ধর। এটা কোন অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে হৃদয়-মন আলোকিত করে পূর্ণ ব্যুৎপত্তির সাথেই আমি ও আমার অনুসারীগণ এই তাওহীদের আলোকিত পথ অবলম্বন করেছি এবং সকলকে এদিকে ডাকছি। আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করছি আল্লাহ তাআলা সব রকম অংশীবাদিতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র এবং আমরা তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা- শিরক ও মুশরিকদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। -অনুবাদক


১০৯


وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوحِي إِلَيْهِم مِّنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ ۗ أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۗ وَلَدَارُ الْآخِرَةِ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ اتَّقَوْا ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

আমি তোমার আগে যত রাসূল পাঠিয়েছি, তারা সকলে বিভিন্ন জনপদে বসবাসকারী মানুষই ছিল, যাদের প্রতি আমি ওহী নাযিল করতাম ৭০ তারা কি পৃথিবীতে বিচরণ করে দেখেনি তাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের পরিণাম কী হয়েছে? যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আখেরাতের নিবাস কতই না শ্রেয়! তবুও কি তোমরা বুদ্ধিকে কাজে লাগাবে না?


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আপনার পূর্বে আমি যতজনকে রসূল করে পাঠিয়েছি, তারা সবাই পুরুষই ছিল জনপদবাসীদের মধ্য থেকে। আমি তাঁদের কাছে ওহী প্রেরণ করতাম। তারা কি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে না, যাতে দেখে নিত কিরূপ পরিণতি হয়েছে তাদের যারা পূর্বে ছিল ? সংযমকারীদের জন্যে পরকালের আবাসই উত্তম। তারা কি এখনও বোঝে না?


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তোমার পূর্বেও জনপদবাসীদের মধ্য হতে পুরুষগণকেই প্রেরণ করেছিলাম, যাদের নিকট ওহী পাঠাতাম। তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে নাই এবং তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছিল তা কি দেখে নাই ? যারা মুত্তাকী তাদের জন্যে পরলোকই শ্রেয়; তোমরা কি বুঝ না ?


তাফসীরঃ

৭০. এটা কাফেরদের একটা প্রশ্নের উত্তর। তারা বলত, আল্লাহ তাআলা আমাদের কাছে কোন ফেরেশতাকে কেন রাসূল বানিয়ে পাঠালেন না?


১১০


حَتَّىٰ إِذَا اسْتَيْأَسَ الرُّسُلُ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ قَدْ كُذِبُوا جَاءَهُمْ نَصْرُنَا فَنُجِّيَ مَن نَّشَاءُ ۖ وَلَا يُرَدُّ بَأْسُنَا عَنِ الْقَوْمِ الْمُجْرِمِينَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

(পূর্ববর্তী নবীদের ক্ষেত্রেও এমনই হয়েছিল যে, তাদের সম্প্রদায়ের উপর আযাব আসতে কিছুটা সময় লেগেছিল) পরিশেষে যখন নবীগণ মানুষের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেল এবং কাফেরগণ মনে করতে লাগল তাদেরকে মিথ্যা হুমকি দেওয়া হয়েছিল, তখন নবীদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছল ৭১ (অর্থাৎ কাফেরদের উপর আযাব আসে) এবং আমি যাকে ইচ্ছা করেছিলাম তাকে রক্ষা করলাম। অপরাধী সম্প্রদায় হতে আমার শাস্তি টলানো যায় না।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান বুঝি মিথ্যায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আমার শাস্তি অপরাধী সম্প্রদায় থেকে প্রতিহত হয় না।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

অবশেষে যখন রাসূলগণ নিরাশ হল এবং লোকে ভাবল যে, রাসূলগণকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে তখন তাদের নিকট আমার সাহায্য এলো। এইভাবে আমি যাকে ইচ্ছা করি সে উদ্ধার পায়। অপরাধী সম্প্রদায় হতে আমার শাস্তি রদ করা যায় না।


তাফসীরঃ

৭১. আয়াতের এ তরজমা করা হয়েছে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও অন্যান্য তাবেয়ীদের থেকে বর্ণিত তাফসীর অনুযায়ী। আল্লামা আলূসী (রহ.) দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনার পর এটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তবে আয়াতের আরও বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। অন্যান্য মুফাসসিরগণ সেগুলোও গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তরজমা যে তাফসীরের ভিত্তিতে করা হয়েছে, সর্ববিচারে সেটিই বেশি নিখুঁত বলে মনে হয়। বোঝানো হচ্ছে যে, পূর্ববর্তী নবীগণের আমলেও ঘটনা একই রকম ঘটেছে। যখন কাফেরদেরকে প্রদত্ত অবকাশকাল দীর্ঘ হয়ে গেছে এবং এর ভেতর তাদের উপর কোন আযাব আসেনি, তখন একদিকে নবীগণ তাদের ঈমানের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গেছেন এবং অন্যদিকে কাফেরগণ মনে করে বসেছে নবীগণ তাদেরকে আল্লাহ তাআলার আযাবের যে হুমকি দিয়েছিলেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল (নাউযুবিল্লাহ)। অবস্থা যখন এ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তখন সহসা নবীগণের কাছে আল্লাহ তাআলার সাহায্য এসে পৌঁছে এবং অবিশ্বাসীদের উপর আযাব নাযিল হয় আর এভাবে তাঁদের কথা সত্যে পরিণত হয়।


১১১


لَقَدْ كَانَ فِي قَصَصِهِمْ عِبْرَةٌ لِّأُولِي الْأَلْبَابِ ۗ مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَىٰ وَلَـٰكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِّقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ


অর্থঃ

মুফতী তাকী উসমানী

নিশ্চয়ই তাদের ঘটনায় বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের উপাদান আছে। এটা এমন কোনও বাণী নয়, যা মিছামিছি গড়ে নেওয়া হয়েছে। বরং এটা এর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ ৭২ এবং যারা ঈমান আনে তাদের জন্য হিদায়াত ও রহমতের উপকরণ।


মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তাদের কাহিনীতে বুদ্ধিমানদের জন্য রয়েছে প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়, এটা কোন মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্যে পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত ও হেদায়েত।


ইসলামিক ফাউন্ডেশন

এদের বৃত্তান্তে বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যে আছে শিক্ষা। এটা এমন বাণী যা মিথ্যা রচনা নয়। কিন্তু মু’মিনদের জন্যে এটা পূর্বগ্রন্থে যা আছে তার প্রত্যয়ন এবং সমস্ত কিছুর বিশদ বিবরণ, হিদায়াত ও রহমত।


তাফসীরঃ

৭২. কুরআন মাজীদ এক দিকে তো বলছে, সে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা বর্ণনা করে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহের সমর্থন করেছে। কেননা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহেও এ ঘটনা সমষ্টিগতভাবে এ রকমই বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে “সবকিছুর বিশদ বিবরণ” বলে সম্ভবত ইশারা করেছে যে, এ ঘটনার বর্ণনায় পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে কিছুটা হেরফের হয়ে গিয়েছিল। কুরআন মাজীদ সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং বাইবেলের ‘আদিপুস্তক’-এ হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা পড়লে তার বর্ণনা কোন কোন ক্ষেত্রে কুরআন মাজীদের বর্ণনা থেকে ভিন্ন রকম পরিলক্ষিত হয়। খুব সম্ভব সে দিকেই ইশারা করা হয়েছে যে, সেসব ক্ষেত্রে কুরআন মাজীদ প্রকৃত বর্ণনা দান করেছে।

আরো পড়ুন :-

স্মরণ শক্তি বৃদ্ধির দোয়া,মেধা বৃদ্ধির দোয়া,স্মৃতি শক্তি বাড়ানোর দোয়া!নামাজের পর ২১ বাড় পড়ুন

দোয়াটি পড়লে সাথে সাথে রাগ কমে যায়, রাগ কমানোর দোয়া,শিশুদের রাগ কমানোর আমল

(ads1)

(getButton) #text=(আল কোরআন বাংলা অনুবাদ ) #file=(Al Quran Bangla) #icon=(download) #size=(25) #color=(#d10404) #info=(PDF Download)


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)

islamicinfohub Top Post Ad1

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top